রবিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

অণুগল্প হঠাৎ এক রাতে আজমেরী সুলতানা সাথী





















অণুগল্প
হঠাৎ এক রাতে
আজমেরী সুলতানা সাথী 


অনেক পুরনো একটা তিনতলা বিল্ডিং। এতিমখানার জন্য সরকারী জমি নিয়ে মহিলাদের হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। নিচে কয়েকটা এতিম বাচ্চা রেখে সরকারকে দেখিয়ে হোস্টেল থেকে ভালো অঙ্কের টাকা ইনকাম করছে, হিরা নামক একজন হিজরা মহিলা। যাক ওসবে আমার নাক গলিয়ে কাজ নেই। কারন ঢাকায় এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে, এটা কোন ব্যাপার না। আমি এসেছি আমার বান্ধবীর কাছে একটা ইন্টারভিউ আছে সেজন্য। সে বাংলা মোটরে এ হোস্টেলেই থাকে।
তিনতালার উপরে ছাঁদের পূর্বদিকের দুটি রুম। একটিতে আমার বান্ধবী ও এক বড় আপু থাকে। ছাঁদটা বেশ বড়, খোলামেলা। পুরনো বিল্ডিং হলে ও ভালোই লাগছে। কারন ছাঁদ আমার এমনিতেই পছন্দ। খোলা আকাশ, চাঁদ, জোছনা, বাতাসের দোল, সবকিছু ছাঁদ থেকে খুব ভালো অনুভব করা যায়। সব মিলিয়ে আমার ভালোই লাগছে।
আমার বান্ধবী..... অহ্ স্যরি! সে তখন থেকে আমার বান্ধবী, আমার বান্ধবী করে যাচ্ছি। আসলে তার নাম হলো দিথী।
দিথী অবশ্য আমাকে অনেক বার হোস্টেলে আসতে ঢাকায় আসতে বলেছিলো, কিন্তু আসা হয়নি। এবার ইন্টারভিউয়ের সুবাদে এলাম।কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেল। আমার শনিবার দিন ইন্টারভিউ আর দিথী শুক্রবার রাতের ফ্লাইটে অফিসের কাজে কক্সবাজার কনফারেন্সে যাবে। বড় আপুটা ও সকালে তার মামার বাড়ি চলে যাবে। মানে রুমে শুধু আমি একা। যদিও কেমন যেন মনটা খচখচ করছিলো তবু মনে সাহস নিয়ে বললাম ঠিক আছে সমস্যা নেই, থাকতে পারব।
শুক্রবার দিনে সকালটা আমরা দুজন একটু ঘুরলাম। মৌচাক মার্কেট থেকে দুজনে মিলে কেনাকাটা করলাম। দুপুরে হোস্টেলে এসে গোসল সেরে আমি আবার বেরিয়ে পড়লাম। ফেসবুক সুবাদে টুকিটাকি লেখার শখ, আর সেখান থেকেই কিছু পরিচিতি। আর শুক্রবার বিকেলে সেই পরিচিত কিছু মুখ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেখানে আমার একজন দাদাও আসছে, তাই দেখা করে অনুষ্ঠানে যোগ দিব।
যথারীতি দেখা হলো অনুষ্ঠানে গেলাম। অনেক গুণীজনদের সাথে পরিচিত ও হলাম। ভালো লাগছিলো, কারণ স্বরচিত একটা কবিতাও আবৃত্তি করার সুযোগ পেলাম। অনুষ্ঠানের ফাঁকে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেলো টেরই পেলাম না।
দিথী ফোন করল, গান বাজনার ভিড়ে আমি ওর কথা কিছুই শুনতে পেলাম না। তবুও আমি জোরে জোরে বললাম আমি এখনি আসছি। ফোনে একদম চার্জ নেই, বন্ধ হয়ে গেলো। দাদাকে বলে তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে সোজা বাংলা মোটর ওভার ব্রিজের কাছে যাব। কষ্ট করে ওভার ব্রিজের উপর দিয়ে না গিয়ে নিচে দিয়েই রাস্তা পার হলাম। তারপর গলির মোড় ধরে সোজা দ্রুত হাঁটা ধরলাম। কারন দিথীর রাতে ফ্লাইট ও বেরিয়ে যাবে। এমনিতে ৮ টা বেজে গেছে দেরী হয়ে গেলো। আরো আগেই বের হওয়া দরকার ছিলো। কিন্তু একি আমি হাঁটছি তো হাঁটছি কিন্তু হোস্টেল কোথায়! হোস্টেল আর খুঁজে পাচ্ছি না। কি করি এখন, ফোনটা ও যে বন্ধ হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম ভুল করে অন্য গলিতে ঢুকে পড়েছি।
রাস্তায় দু, তিনজন রিকসা চালককে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু ওরা হোস্টেল টা চিনে না। বাংলা মোটর ব্রিজের কাছে এই একটায় হোস্টেল অথচ ওরা চিনে না। কি আজব! তবে আমি কোথায় আসলাম।
মাথাটা ঠান্ডা করে ভাবলাম কি করা যায়। হঠাৎ মনে হলো, আমি ব্রিজের কর্ণারটা আগে খুঁজে বের করি। সেখান থেকে হোস্টেল টা দেখা যায়। আর কাউকে জিজ্ঞেস না করে প্রায় দু গলি পেরিয়ে অবশেষে ব্রিজের কর্ণারে এলাম। মনটা স্বস্তি লাগছে। এতক্ষণ একটু ভয়ে ছিলাম একেত আমি একা, আবার রাস্তা ভুল। আর কোন সমস্যা নেই এবার হোস্টেলের দিকে এগোলাম।
দিথীর ব্যাগপত্র পুরো গুছানো কমপ্লিট। সে নিজেও রেডি হয়ে আমার ফোনে বারবার ট্রাই করছে। কিন্তু অফ থাকায় টেনসন করছে। আমাকে দেখে ধমক দিয়ে বলল কিরে ফোন বন্ধ আর এত দেরী কেনো?
আমি রীতিমত হাঁপিয়ে গেছি, বসে একটু রিলাক্স নিয়ে ওকে সব বললাম। দিথীর যাবার সময় হয়ে গেলো, ওর গাড়ি চলে এসেছে। যাবার আগে পাশের রুমের এক আপুকে আমার সাথে থাকতে বলে গেলো। একা একা যদি ভয় পাই।
রাত ৩ টা বাজে। হোস্টেলের পাশের বিল্ডিং টাতে ওয়াই ফাই কানেক্ট আছে। হোস্টেলের ছাঁদে দাঁড়িয়ে কানেক্ট পাওয়া যায়। আপু একজনকে দিয়ে পাসওয়ার্ড টা কালেক্ট করে এ সুবিধা টা ভোগ করে। আজ ও ছাঁদের কর্ণারে দাড়িয়ে ওয়াই ফাই দিয়ে গান লোড দিচ্ছে। কিন্তু পাশের বিল্ডিংয়ে কতগুলো ছেলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ওরা এদিকেই ছাঁদে আপুকে দেখেই হাসছে, টিজ করছে। নিজেরা নিজেরা নিজেদের মধ্যেই দুষ্টুমি করছে। এত রাতে ও পাশে ছাঁদে একা একটা মেয়েকে দেখে ওদের ফিসফিসানি বেড়ে গেছে। আপু ওদের ফিসফিসানির মাত্রা দেখে রুমে চলে আসবে ভাবছে। এর মধ্যে কারেন্ট চলে গেলো। কিন্তু ওপাশটাতে ও হঠাৎ ছেলেগুলো উধাও।
যাক, আপু ও রুমে এসে দরজা আটকাতে গেলো। কিন্তু এ কি দরজা লাগছে না। আপু যতই ভিতর থেকে টান দেয় ততই মনে হয় বাইরে থেকে কেউ জোরে বিপরীতে টানছে। আপু ভয়ে চিৎকার করে উঠল। আমাকে বলছে উঠো উঠো। আমি এতক্ষণ শুয়ে ছিলাম, আপুর চিৎকারে লাফ দিয়ে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? দেখি আপু তার সবশক্তি দিয়ে দরজাটা টেনে ধরে আছে। আপু বলছে , দরজা লাগছে না বাইরে থেকে কে যেন টেনে ধরে রাখছে। আপুর মনের ভিতর ভয় ঢুকে গেলো, তবে কি সে ছেলেগুলো ছাঁদ টপকে আমাদের ছাঁদে চলে আসছে!! আমাকে বলল লাইট অন করো। কিন্তু কারেন্ট তো চলে গেছে। দরজার বাইরে কোন আওয়াজ পাচ্ছি না, কিন্তু আপু আমি দুজন মিলে টানছি তবু ও দরজা লাগছেনা। কি করি এখন!!
আপু বলল, মেট্রোন আপাকে ফোন দেও। কিন্তু আমার কাছে তো মেট্রোন আপার ফোন নাম্বার নেই। বলল, আমার ফোনে আছে সেটা দিয়ে ফোন দাও। কিন্তু মেট্রোন আপা ফোন তুলছে না। এত রাতে সবাই ঘুমে বিভোর। কিন্তু গলা বুক শুকিয়ে গেছে, কান্না পাচ্ছে। আপু অনেক শক্ত ভয়ে ও সাহস ধরে রেখেছে। আর বলছে, কে ওপাশে!! চলে যান বলছি, নয়তো কিন্তু খুব খারাপ হবে। আমি মেট্রোন আপাকে আসতে বলছি, উনি আসছে। কিন্তু তবুও কোন সাড়া পাওয়া গেলো না। আগের মতই টেনে ধরে আছে, দরজা লাগাতে পারছিনা। আপু বলল, দেখতো মোবাইলের টর্চে ওদের পা দেখতে পাও কিনা! আমি মোবাইলের টর্চ লাইট জ্বালিয়ে দেখলাম, কিন্তু কারো কোন পায়ের ছায়া নেই।
কি করব ভয়ে সোচনীয় অবস্থা। এরই মধ্যে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে এলো। আপু আরো একটু সাহস পেলো। ভয়ে আমরা দরজাটা ছেড়ে দেইনি টেনে ধরে রাখছি। কারন রুমে আমরা দুটি মেয়ে মাত্র, ওরা যদি ঢুকে পড়ে!!
বিদ্যুৎ আসাতে আপু সাহস করে বলল, আমি জোরে টেনে ধরছি, তুমি দরজার কাছে গিয়ে দেখো কজন, কটা পা দেখা যায়!
আমি সাহস করে দরজার কাছে গেলাম চুপি দিয়ে ভালো করে দেখতে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। আমি নিচের ফ্লোরে বসে পড়লাম। আপু বলল কি হয়েছে কজন দেখলে?
বললাম, একজনও দেখিনি কিন্তু একটা জিনিস দেখেছি। সেটা কি দেখবে?
আপু বলল, কিভাবে! দরজা টেনে আছি যে। আমি বললাম, ছেড়ে দাও। ওর হাত ছাড়িয়ে একটু কাছে নিয়ে দেখালাম দরজায় চিপায় একটা জুতো আটকে আছে যার জন্য দরজাটা কিছুতেই লাগছেনা।
আপু এবার সত্যিই কেঁদে দিলো একসাথে হাসলোও। আসলে এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, দরজায় চিপায় কিছু আটকে থাকতে পারে এ চিন্তা মাথায়ই আসেনি। ধ্যাত মিছিমিছি কি ভয়টা না পেলাম।
এখন নিজের নিজেদের বোকা বোকা ভয় মনে করে খুব হাসি পাচ্ছে। আপু আর আমি দুজনে প্রচন্ড হাসলাম। সে রাতে আর ঘুম হলোনা। আমরা ভয় জয়ের হাসি হেসেই কাটালাম।
কি আপনারা কি ভেবেছিলেন!! আসলে রাতের এ কাহিনী টুকু আমার কল্পনা। দিথী যাবার আগে আমাকে এ কাহিনীটা বলে গেছে। এ কাহিনীটা সত্যি ঘটেছে তবে আমার সাথে নয়। আমার বান্ধবী দিথী ও তার রুমের বড় আপুর সাথে। দিথী যাবার আগে আমাকে আশঙ্কামুক্ত করতে ভিতরে একটু আশঙ্কা ঢুকিয়ে দিয়ে গেলো। আমিও প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলাম পরে ভীষণ হেসেছিলাম দুজন মিলে। একটা জুতোকে কেন্দ্র করে এত ভয়! সত্যিই বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং।
তাই বিষয়টি কল্পনায় দৃশ্যায়ন আর উপলব্দি করতে করতে আমার রাত ভোর হয়ে গেলো। কিন্তু ঘুমদেবী আর এলোনা।
পরেরদিন ভোরে আমি ইন্টারভিউ দিয়ে চলে আসি বাসায়। কিন্তু এখনো সেই হোস্টেলের পুরনো বিল্ডিংয়ের এক রাত্রির কথা মনে পড়লে খুব হাসি পায়।
আজ আর নয়, ভালো থাকবেন সবাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন