লেখক পরিচিতি :-
নাম: সন্দীপ দাস
পিতা: সদানন্দ দাস
মাতা: ভারতী দাস
ঠিকানা: রূপনগর , রূপনারায়নপুর , আসানসোল , বর্ধমান , পশ্চিমবঙ্গ , ভারত
জন্ম: 16-09-1987
শিক্ষাগত যোগ্যতা: বি.এ. (ইংরেজি)
পেশা: চাকুরী
প্রকাশিত গ্রন্থ: হারানো কথা ( 2017 ); এছাড়া বাংলাদেশের দুটি জায়গায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ।
অর্জিত পুরস্কার: নেই
লেখালেখি শুরু: 2007
(১)
পরিবর্তনশীল আধুনিকা
১।।
গল্পটি
শুরু করার আগে বলে রাখা ভালো , কারুর জীবনের ঘটনা এ প্রকার হতেও পারে আর
নাও পারে । তবে হলে , লেখকের দায়িত্ব খুবই কম , কারণ এ নিছক এক পুরানো
বন্ধুর থেকে শোনা তারই জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । শুনে বিশ্বাস হয় না ,
সময়ের সাথে সাথে চেহারা এক থাকলেও মানুষ বদলে যায় কীভাবে ? কিভাবে একজন
সহজে অস্বীকার করতে পারে কারুর সাহায্য , যা কোন একদিন জীবন মৃত্যুর মাঝে
ঝুলে থাকা কাউকে বাঁচিয়েছিলো । আজ সে সম্পূর্ণ সুস্থ , নতুন জীবন শুরু করার
মুখে । সে আজ সুস্থ এক ব্যক্তি , তবু ভুলে গেছে সেদিনের শুভ কে । আজ্ঞে
হ্যা ! আমার বাল্য বন্ধু শুভ দত্ত । দেখতে লম্বা , ছিমছাম চেহারা , কিন্তু
ভাগ্য ততটাই ছোট । অপরের সাহায্যে কোন দিন পিছু পা হতে দেখিনি তাকে । আজ
হঠাৎ দেখা ধর্মতলার মোড়ে । ব্যাস , সোজা তুলে নিয়ে গেলো আমায় তার বাড়ি ,
আমতলায় । বললো দু দিন থেকে যেতে হবে । না ! আবদার ফেলতে পারি নি আমি । আর
এতো দিন পর কাকিমার হাতের রান্না আমিও চাই নি মিস করতে । সুতরাং থেকেই
গেলাম ।
আজ শনিবার । ওদের আবার নিরামিষ । তবে
কোলায়ের ডাল আর আলু পোস্ত দিয়ে ভাত ; উফ সে যেন অমৃত । এ যুগেও যে এভাবে
খাওয়াতে পারে কেউ , না গেলে সে পুরোনো বাঙালিয়ানা খুঁজেই পেতাম না কোনদিন ।
যাই হোক , খাওয়া পর্ব শেষ । এবার বিশ্রামের পালা ।।
শীতের
দুপুর , বাইরের রোদে বসে বসে দুই বন্ধুর সে এক জমজমাটি আড্ডা । বললাম ,
ভাই শুভ , কি করছিস এখন ? সেই এম সি এ করে কলেজ ছাড়ার পর এই দেখা । অনেক
বদলে গেছিস এতো বছরে ।
শুভ এক গাল হাসি মুখ করে বলে
উঠল , টি সি এস এ একাউন্টস সামলাই । দারুন চাকরি । কথায় কথায় অনেক কথাই হলো
, অনেক কথাই বললাম তাকে । জানলাম , স্কুলের বন্ধুরা এক এক করে বিয়ে করে
নিয়েছে , সবাই প্রায় ওয়েল সেটল । রাগ হচ্ছিলো নিজের ওপর । আমরা দুই বন্ধুই
বুঝি দুটো পাকা ধ্যারোস । কিছুই পারি না ।
শুভ নিজের
জীবনের অনেক অন্তরঙ্গ এপিসোড শোনাচ্ছিলো । হটাৎ ওকে থামিয়ে , আমি বলে
উঠলাম , হ্যারে , সেই পাগলির কি খবর ? বেশ হত্চকিয়ে উঠে বসলো সে । শুভর মুখ
দেখে মনে হচ্ছে , রাগে দাঁত কিরকির করছে ওর । বেশ জোরে বলে উঠলো শুভ ,
শুভশ্রীর কথা মুখে আনবি না আর । ওর মতো দু নম্বরি আর দুটো দেখি নি । জীবন
ফিরিয়ে দিয়েছিলাম রে ওর , আজ এই পরিণাম দিলো । বেশ অবাক হলাম শুনে , যে শুভ
এই শুভশ্রী কে প্রানের থেকে বেশি ভালোবাসত , যাকে ছাড়া শুভর দিন হতো না ,
রাত হতো না , তার সম্বন্ধে এই মন্তব্য । তাও শুভর মুখ থেকে , ব্যাপারটা ঠিক
হজম হচ্ছিলো না আমার । কি এমন হয়েছিল , ঠিক করলাম এই দু দিনে জেনে ফিরবই ।
বেশ
কবার এ বিষয়ে শুভকে জিজ্ঞাসাবাদ চালালাম , তবে ও এতটাই রেগে ছিল শুভশ্রীর
নামে যে এক ফোঁটাও বেরোলো না ওর পেট থেকে । সুতরাং , দিবা নিদ্রা হয়ে যাক
একবার , রাতে আবার ফেলু মিত্তির হওয়া যাবে ।।
২।।
সন্ধ্যে
বাতি জ্বলে উঠেছে সারা আকাশ জুড়ে । এতো দিন পর দেখা শুভর সাথে আর হালকা
নেশা হবে না , তা হয় নাকি । সন্ধ্যে বেলার আড্ডা তাই কে এফ সি র সাজানো
বাগানেই কাটানো যাক । হাতে গোল্ড ফ্লেক বড় একটা । টেবিলে সাজানো গেলাস ।
অনেক দিন পর টান দিলাম । শুভর মুড দেখলাম এখন বেশ ভালো । মনে মনে গুনগুনিয়ে
গান করে চলেছে । বেশ ফাইন গলা তো , আমি বলে উঠলাম । নীরব গলায় আস্তে করে
শুভর জবাব , পাগলিটার এই টুকু স্মৃতি আজও রয়ে গেছে রে । বুঝলাম , ভালোবাসার
ঝর্ণা এখনো ঝরে পরছে শুভর বুক থেকে , ভালো লাগলো তবে কৌতুহলটা আরো চেপে
ধরলো আমাকে । দুপুরের ঘটনাটা কি নিছক কোনো ছলনা , নাকি সত্যি শুভর ঐ রূপ ।
জেদ চেপে ধরলো এবার , জানতেই হবে কি ব্যাপার ।।
সুরটা
বেশ পরিচিত , " দেখা হলে বলে দিও আজও বেঁচে আছি "। একটু ডিসটার্ব করে
শুভকে এবার একটু লেগ পুল করে বসলাম । " কিরে প্রেম যে আর ধরে না , তবে
দুপুরে যে অভাবে দাঁত খিঁচিয়ে শুভশ্রী র চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করছিলিস যে " ।
শান্ত ভাবে শুভ বলে উঠলো , ভালো সে আজও বাসে ওকে , বাট , মাস খানেক আগে ও
যে ভাবে ব্যবহার করেছিল শুভর সাথে , ঠিক বিশ্বাস হয়নি শুভর । এতটা বদলে গেল
মেয়েটি ।
আমার ও বিশ্বাস হচ্ছিলো না , শুভর কথায় ।
শুভ মেয়েটির জন্য যা করেছিল , আমি তো দেখেছি । দিনের পর দিন ওর পাগলামো
সামলেছে , বিয়ে না করেও মিথ্যা বরের অভিনয় চালিয়ে গেছিলো শুভ । নিজের
ভালোবাসা ভুলে শুধু মেয়েটির জীবনের চিন্তা করে গেছিলো । এটা আজকের দিনে কজন
করে , বলতে পারো ।।
রাত এখন দুটো বাজে , ঠিক ঘুম
আসছে না । একদিকে নেশার ঘোর অন্যদিকে শুভশ্রীর আর শুভর সেই কলেজ দিনের গপ্প
গুলো ভেসে উঠছে চোখের সামনে । কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে শুভশ্রী । ধপধপে
ফর্সা , হেভি স্মার্ট । অন্যদিকে শুভ , লাজুক ছেলে , মেয়েদের ছোঁয়া থেকেও
লজ্যা , এমন ছেলে জন্মে দেখি নি । তবে শুভশ্রীর প্রতি হেভি টান ওর ।
বন্ধুত্ব ও হয় , বেশ গভীর । একসাথে ওঠা বসা । দিন রাত তখন কলেজে একটাই
চর্চা , শুভ আর শুভশ্রী । ভাবতেও পারছি না এই শুভ আজ ঐ নাম শুনলে রেগে
যাচ্ছে । অবাক কান্ড ।।
দিন ঘুরতে লাগলো , সেদিন কলেজ
ফাংশান । স্টেজে তখন শুভশ্রী উঠেছে , গান শোনাবে সে । অসাধারণ গলা , বলে
বোঝাবো কি করে । আর অন্যদিকে একদম সামনের সারিতে সেই চেনা মুখ , মি.রোমিও ,
শুভ । ভাবতাম ব্যাটা বোর হয়ে যায় না , একেই বলে ভালোবাসা । ছেলে খেলাধুলায়
ভালো , খেলার মাঠে তার চিয়ার লিডার , থাক আর বলছি না নামটা । যেন এরা মেড
ফর ইচ আদার । তবে , দিন এগিয়েছে , বন্ধুত্ব আরো ঘন হয়েছে , কিন্তু শুভ আজ
অবধি বলতে পারেনি তার মনের কথা শুভশ্রী কে । কে জানে কোনোদিন পারবে কি না
বলতে !!
সেদিন সোমবার , কলেজের কমন রুমে শুভ দেখি বসে
আছে । দু তিন বার ডাকলাম , শুনতে পেল না । কাছে গিয়ে দেখি মুখ ভার ।
জিজ্ঞাসা করলাম , কি হয়েছে । বললো গতকাল ও আর শুভশ্রী , সিটি সেন্টার
গেছিলো । ভাবলাম এ তো ভালো খবর । শুভ তখন ও বলে চলেছে ওরা কি কি করলো ,
কেমন এনজয় করলো । ওর মুখ থেকেই শুনলাম , শুভশ্রী ওকে একটা শেরওয়ানি গিফট
করেছে । কৌতূহল বসত: প্রশ্ন করলাম , শেরওয়ানি কেন ? এবার বেশ কাঁদো কাঁদো
মুখ করে শুভ র জবাব , আগামী মাসে শুভশ্রীর বিয়ে । আমাকে বিয়ে বাড়িতে থাকতেই
হবে , তাই ।
ধূস ! এতো তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেলো ।
বলার সময়টাও পেলো না ও । কেঁদে আর কি লাভ । বললাম , ছেলে কী করে ? বললো
ছেলের বহরমপুরে বিশাল ব্যবসা আছে । এদিকে শুভর চোখে জল , ওদিকে আমার মনে
কৌতুহল , এতো হিট জুটি তাহলে শেষ ! এদিকে আমি ভেবে চলেছি , ওদিকে দুরে
বিধাতা আড়াল থেকে হেসে চলেছে ...
রাত অনেক হলো । আজ থাক , ঘুমিয়ে পরা যাক , কাল ,পরশু করে বাকিটা শোনাবো ।।
৩।।
নতুন
ভোর হয়েছে । আমাদের জীবনে আর গল্পের প্রাণে । শুভ দেখলাম রেডি , বললাম
কোথাও যাবি নাকি ? সে বেশ ইয়ার্কি মেরে বললো , চল না চড়ে আসি একটু । একদিকে
আমার মাথায় তখনও সেই অতীতের ঘোর , টিকটিকিগিরিটা তখনও থামেনি আমার মাথায় ।
শুভ
কিন্তু বেশ ফ্রেস মুডে , খালি গলায় গান ধরেছে , "ক্যাইসে মুঝে তুম মিল
গ্যায়ী " । ভালো লাগছে ওকে এতটা খুশি দেখে । আমিও তৈরি হয়ে নিলাম ফটাফট ।
আমাদের সকলের গন্তব্য , মেট্রো সিনেমা । তারপর বিগবাজারে শপিং আর বিকেলে
কালকের মতোই কে এফ সি র সাজানো বাগান ।।
শুভ কাম মে
দের কৈশি । আমিও তৈরি হয়ে নিলাম । শুভর বাইক তখন দুরন্ত গতিতে ছুটছে । না !
অন্য রাস্তা মনে হচ্ছে । আরে , এ যে দক্ষিণেশ্বর । গাড়িটা হটাৎ রাস্তার
ধারে থামিয়ে দিলো শুভ । বেশ ভারি গলায় , শুভ বলে উঠলো , এইখানেই প্রথম
শুভশ্রী কে একটা প্রপোজাল দিই । ক্যান আই কিস ইউ ? উত্তর না । আর তারপর সেই
মর্মান্তিক সংবাদ শোনালো আমাকে । " আই এম গেটিং ম্যারেড বাই নেক্সট মান্থ ,
ইউ হ্যাব টু লিভ উইথ ফ্যামিলি । ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড । " আর তার দিন
তিনেক পরেই সেই ঘটনা । সুইসাইড । এই প্রথম দেখলাম শুভর গলাটা ভারি আর চোখে
জল । কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না । শুধু ওর পিঠে হাত রাখলাম একবার ।।
সারা
কলেজ জুড়ে শোরগোল । এম্বুলেন্স , পুলিশ ভোরে আছে কলেজ চত্বরে । রুটিন
জানতে ফোন করেছিল শুভ । ওর আবার জ্বর , কলেজে আসতে পারেনি তাই । আমিও বললাম
না তাই কিছুই । কিন্তু এ খবর কি আটকে থাকে , না রাখা যায় । দু দিন ধরে
শুভশ্রীর কোন খবর পাইনি শুভ , ফোনটাও তুলছে না । জ্বর গায়ে একটা অস্বস্তি
ভাব তাই । কিন্তু অন্যদিকে , তখন উৎকণ্ঠা , জীবন মৃত্যুর লড়াই লড়ছে শুভশ্রী
। ডাক্তার ৭২ ঘন্টা টাইম দিয়েছে । কিছুই হতে পারে যে কোন মুহূর্তে ।
হাসপাতাল জুড়ে ভিড়ে ভিড় । ছাত্র , ছাত্রী , গার্জেন , টিচার পুলিশ সবাই
অপেক্ষায় , কখন জেগে উঠবে শুভশ্রী । সবাই রয়েছে সেদিন , নেই শুধু শুভ আর
দূরে বসে বসে আমার একটাই চিন্তা , কি করলো এটা শুভশ্রী , আর কেনই বা করলো ?
কদিন পর বিয়ে আর...ছি: ছি:... এসব কেউ করে ! এক একবার মনে হচ্ছিলো শুভ এর
জন্যে দায়ী নয়তো । আবার এই ভেবে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম যে ছেলেটা কদিন আগে
স্কুল রিইইউনিয়ণ পার্টি তে মদ্যপ অবস্থায় থাকা শর্মিলাকে সেবা করে যে ভাবে
প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলো , সে কিছু করেছে , মানতে পারলাম না ।।
দেখতে
দেখতে তিন দিন কাটলো , হোস ফিরলো শুভশ্রীর । সবার মুখে একটা খুশির ভাব
দেখা যাচ্ছিল যখন ডাক্তার বেরিয়ে এসে এই খবরটা দিলো । সবাই তখন শুভশ্রী কে
একবার দেখা করার জন্য ব্যাকুল , এদিকে বাঁধ সাধলো ডাক্তার । ঘোষণা হলো ,
শুভশ্রী সবার আগে শুভর সাথে দেখা করতে চায় ।
পরিবারের
মুখে একটা অবাক হয়ে চেয়ে থাকার ছাপ , কে এই শুভ ? শুভশ্রীর সাথে ওর কি
সম্পর্ক ? আর বাকিদের মুখে একটাই প্রশ্ন , সত্যি তো শুভ কোথায় ? এদিকে আমি
তখনও ভাবছি , শুভকে কি একটা খবর দেব ।
এরই মাঝে দূরে
একটা চেনা মুখ দেখলাম বলে মনে হলো , একটা চেনা গলা খুঁজছে যেন শুভশ্রীকে ।
এতো আতঙ্কের মাঝেও সবার নজর তখন সেই মুখটাতে এসে আটকালো , আর আমি অবাক
দেখলাম যে শুভ হাজির । তবে, কে বলল ওকে শুভশ্রীর খবর ?
৪ ।।
সত্যি
সত্যি ওটা শুভ ছিল । আস্তে আস্তে রুমে ঢুকলো সে । শুভশ্রী তখন চোখ বুঝে
শুয়ে আছে । শুভর ছোয়ায় চোখ খুললো । চোখ দুটো জলে ভর্তি , ফোঁটা ফোঁটা গড়িয়ে
পড়ছে গাল বেয়ে । কাঁদতে কাঁদতে শুভর হাত দুটো চেপে ধরলো সে । অনবরত এক কথা
, কেন তাকে বাঁচানো হলো , সে ওর কাছে যেতে চায় । শুভর মাথা যেন বন বন করে
ঘুরছে । কি বলছে এ সব , কি হচ্ছে এ সব । রুম থেকে বেরিয়ে এলো শুভ । ওর মা
কে ডেকে বললো একে বিষ দিতে বলুন আর ওর মৃত্যুর সমস্ত দায়িত্ব আমি নিলাম ।
সবাই অবাক , এসব আবার কি উল্টো পাল্টা বকছে ছেলেটি ।।
এদিকে
তখন শুভশ্রীর মায়ের চোখেও জল । কিছুক্ষন এই ইমোশনাল সিন চললো । তারপর
মায়ের মুখ থেকে যা শুনলাম , আমরা সবাই তো অবাক ! কি বলছেন উনি । শুভশ্রীর
যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা , সে অলরেডি দেড , তাও চার বছর আগে ।।
দক্ষিনেস্বর
ছেড়ে আমরা এখন কফি হাউসে । আড্ডা আর গান , পুরো মেজাজে চলছে । হটাৎ বেশ
নস্টালজিক হয়ে শুভ আমাকে বলে উঠলো , জানিস সেই ছেলেটি , আরে বহরমপুরের যার
সাথে পাগলির বিয়ে হতো , তার দাদার সাথে সেদিন কথা হচ্ছিল । শুভশ্রী নতুন
বিয়ে করেছে , মুম্বাইতে আছে । শুনেও ভালো লাগলো , মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠেছে ।
তবে এর পুরো কৃত্বিত্ব একা শুভর । মেয়েটি যেদিন সুসাইড করে তার কয়েক দিন
আগেই সে ছেলেটির মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে পারে । তারপর রাতে হোস্টেলের রুমে
বসে লিকুইড মোরটিন খেয়ে নিয়েছিল । ছেলেটিকে খুব ভালোবাসতো নাকি শুভশ্রী । এ
সবই সেদিন হাসপাতালে তার মায়ের মুখ থেকে শোনা ।।
এদিকে
শুভকে এক কোনায় নিয়ে এসে আমি জানতে চাইলাম যে ওকে এ বিষয়ে কে বলল । জানলাম
, ও শুভশ্রী কে ফোনে দুদিন না পেয়ে ওর বান্ধবি তৃষা আগারওয়াল কে ফোন করে ।
ওই বলে যে শুভশ্রী নে সুসাইড কিই হ্যায় । এই খবর পেয়ে আর থাকতে পারে নি
শুভ । ভোরের ট্রেনে চলে আসে সোজা হাসপাতালে আর বাকিটা তো শুনলেনই আগে । তবে
শুভর সেদিনের ঐ মৃত্যু দায়িত্ব তুলে নেওয়া আমার একদম ভালো লাগে নি । আর
বাড়াবাড়ি যাতে না করতে পারে , তাই ওকে নিজে সোজা বাড়ি চলে এলাম ।।
এদিকে
বাড়িতে আরেক কান্ড । এসব ঘটনা শুনে শুভর বাবা তো রেগে আগুন । বলেই বসলেন ,
এবার কিছু হলে ছেলেকে পুলিশে তুলবে , দেখো ছেলের কান্ড । শুভর মা কিন্তু
কিচ্ছু বললো না । ছেলেকে কতটা ভালোবাসে তা আজ রাতের খাওয়ার টেবিলে বুঝে
গেলাম । মাংস করেছেন , তবে ছেলে খাসি ভালো বাসে তাই তার জন্য আলাদা রান্না
হয়েছে । আমার জন্য নিরামিষ কারণ আমি আবার ওসব খাই না আজকাল ।।
রাত
কাটলেই চলে যেতে হবে । তাই ব্যাগ টা গুছিয়ে রাখলাম । রাতে জমিয়ে আড্ডা হলো
আজ । নতুন পুরোনো কত কথা , আর এই প্রথম শুভর মুখ থেকে শুনলাম শুভশ্রী
কিভাবে তাকে অপমান করেছে । খুব খারাপ লাগলো শুনে । সাথে মনে হলো মানুষ
কিভাবে পাল্টে যায় । পয়সা সবাইকে পাল্টে দেয় । সত্যি বড়োই বিচিত্র এ নিয়ম
!!
৫ ।।
রাত
থেকেই জ্বর । কাল যে যাওয়া হচ্ছে না এটা তো সিওর । তবে রাত ভর এই পাগলামটা
শুভ যে কি করে সহ্য করেছে তাই ভাবছি । অবশ্য এটাই প্রথম বার নয় ।
শুভশ্রীকেও ঠিক এই একই ভাবে সামলেছিলো শুভ । তাও দিনের পর দিন । ওর ক্রেডিট
আছে বলতে হয় । এমনি অনেক কিছুই ভাবছি , এদিকে চায়ের কাপ হাতে হাজির শুভ ।
একদম নিজের স্টাইলে বলে উঠলো , টি ব্রেক ।।
চা খেতে খেতে অনেক ভাবনাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো । এবার আর পারলাম না চেপে
রাখতে
। জিজ্ঞাসা করেই বসলাম শুভকে , তুই কি সত্যি শুভশ্রী কে লাইক করতিস ? বেশ
চাপা গলায় উত্তর এলো হুম । আমি বললাম , তবে এত দিন শুধু অভিনয় করে গেলি কেন
? ওর মায়ের কাছে একবার মন খুলে বলতেই পারতিস !
শুভর
গলাটা বেশ নরম মনে হলো । শুভশ্রীর সঙ্গে হবু স্বামীর অভিনয়টা তার কাছেও বেশ
কষ্টকর ছিল এটুকু তো বুঝি , বাট , কি করে পারলো সে এই অভিনয় করতে । শুভ
বললো , সেদিন ওর মা আর ডাক্তার বাবুর রিকুয়েস্ট ফেলতে পারিনি । শুরু করি
শুভশ্রীকে সুস্থ করার অভিনয় । ওর মন থেকে সুইসাইড এর ভূত নামানোর অভিনয় ।
ওর কত চাহিদা হাসিমুখে পূরণ করেছি কে জানে , শুধু শরীর বাদ দিয়ে ।
জ্বর
গায়ে শুনছি আর কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে । দিনে কত বার ফোন করতাম ,হিসাব
নেই । যা তা বলে যেতাম , আর এটা কাজও করছিলো । ডাক্তার বললো এতো কুইক
রিকভারি কোনোদিন দেখেনি সে , কিন্তু আমি তো জানি , কিছুই উন্নতি হয় নি ।
নাহলে সেদিন , বিগবাজারে দাঁড়িয়ে শুভশ্রী আবার সুসাইড করবে বলে ! বেশ অবাক
করা হলেও এটাই সত্যি ।
এর পর কলেজ শেষ হলো ওদের এক
মর্মান্তিক ভাবেই । শুভ পাস করলেও শুভশ্রীর পাস করা আর হলো না । আর এর পর
শুভশ্রী আর এগোতেও চাইলো না ।। শুভ বেশ হারে হারে টের পাচ্ছিলো যে কেসটা
বেশ জন্ডিস । কোন রাস্তাও পাচ্ছিলো না । শুরু হলো কাকিমার কাছে আরেক অভিনয়
যে শুভশ্রী সম্পূর্ণ সুস্থ । ওকে বিবিএ ও এম বি এ পড়তে সাউথে পাঠিয়ে দেওয়া
হোক । এটাই যেন ওকে সুস্থ করার শেষ উপায় শুভ দেখতে পাচ্ছিলো আর শুভশ্রীকে
বোঝানোর দায়িত্ব শুভ নিজে নিলো ।।
না , দুপুরের খাবার
সময় হয়ে গেছে । আজ মেনু মাছের মাথা , তবে ওই যে বলেছিলাম যে আমি নিরামিশি ,
তাই আমার জন্য স্পেশাল ধোঁকার ডালনা হয়েছে । খেয়ে উঠে আর শরীর চলছিল না ।
অতএব , ফেলু মিত্তির কে সরিয়ে রেখে এক ঘুম এই দুপুরে ।।
৬।।
রাত
কেটে ভোর হল ।। সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে শুভর গাড়ির পিছনে সোজা ধর্মতলা
।। বাস ছাড়বে ঠিক ৮.২০ ।। বাসের টিকিট কেটে দিলো শুভ নিজে , আমাকে পেমেন্ট
করতেও দিলো না ।। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল আজ ও স্বাধীন ।। কারণ আজ ও এ জঙ্গলে
এক নতুন পরিবার গড়ার কথা ভাবছে , সঙ্গী হিসাবে পেয়েছে এক বাঘিনী কে , দি
রয়েল বেঙ্গল টাইগ্রেস ।। ভয় পাবেন না , এ বাঘিনী শুভর জীবনে নতুন প্রেম ,
এসেও এখনও ধরা দেয় নি ।।
অনেক কিছুই জানতাম না , আজ
জেনে ফিরছি ।। সেদিন তার চিরদিনের ভালোবাসাকে বেঙ্গালুরুর মাটিতে এম বি এ
করতে পাঠিয়ে দেয় শুভ নিজে ।। নিজে বসে থেকে শুভশ্রীকে রাজি করায় সে ।।
বিমান বন্দরের সেদিন আর এক মাস আগেকার দিনটা মোটেও এক ছিল না ।। সেইদিন
শুভশ্রী ছিল শুভর নয়নের মনি আর এই মাস খানেক আগে কলকাতায় যখন ফিরলো তখন তার
হাতে অন্য একটি হাত ।। বিয়ে করেছে শুভশ্রী ।
শুভর
কিন্তু আগে ভাগেই এয়ারপোর্টে হাজির হয় ।। তবে , তাকে দেখেও না দেখার ভান
করে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় শুভশ্রী ।। আমি বসে আছি বাসে , কিন্তু মনে মনে
অনুমান করতে পারছি কতটা কষ্ট পেয়েছিল শুভ ।।
বিকেলে
ফোন করলে শুভশ্রী তাকে চিনতে অস্বীকার করে এবং সতর্ক করে দেয় যে এর পর ফোন
এলে বা ডিস্টার্ব করলে সে এফ আই আর করবে শুভর নামে ।। শুভ কিছু বলেনি সেদিন
, কাউকে না ।। হয়তো আমাকেও বলতো না যদি কাল রাতে প্রচন্ড চাপ দিয়ে ঝগড়া না
করতাম ।।
আই এম সরি , শুভ ।। ঝগড়া না করে উপায় ছিল না রে ।।
শুধু শুভশ্রীর শেষ কথাগুলো ... না , আজও ভোলেনি শুভ ।। 'সেবা করেছে বলে গায়ে পরার কি আছে , দাম টা নিয়ে নিলেই পারে '?
আমার
বাস আসানসোল ঢুকছে ।। একটু পরে নেমে যাবো , রোজকার কাজে ভুলেই যাবো হয়তো
এত ঘটনা , তাই লিখে ফেললাম ।। কিছু মনে করিস না ভাই ।। তোর মতন ভালো ছেলের
জীবনে ভালোই হবে ।। যে খারাপ তাকে যেতে দে ।। দূর থেকে মনে মনে শুধু এটুকুই
বলে যাচ্ছিলাম ।।
----------------------------×× ××---------------------------- --
(২)
সোনার পাহাড়
সিগারেটের
শেষ কোয়ার্টার টান দিয়ে মাটিতে ফেলে নিভিয়ে দিলেন । এই গরমে বেশ অস্বস্তি
লাগছে , তাই জেগেই রয়েছেন অনাদিবাবু ।। হটাৎ কেমন যেন একটা আওয়াজ পেলেন ।
কিছু ভাঙার শব্দ , জানলা মনে হল । প্রথমে চিন্তিত না হলেও , দ্বিতীয় দিন
আবার মাঝরাতে ওই একই আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় তার ।। তাজ্জব ব্যাপার , পাড়ায়
কোন চুরি বা ডাকাতি হয়েছে বলে শুনতে তো পাননি ।। তাহলে এ শব্দ কিসের ? আর
আজ মনে হল একটা গাড়ি থামল , ভাঙা ভাঙ্গির পর স্টার্ট দিয়েই জোরে বেরিয়ে গেল
। ছাদে দৌড়ে গেলেন অনাদিবাবু , তবে কিছুই দেখতে পেলেন না ।। এরপর নিয়ম করে
দুদিন রাত জেগেছেন । না , কেউ আসে নি আর ।। তবে সন্দেহ যখন হয়েছে ছেড়ে
দেওয়ার মত লোক নয় অনাদিবাবু ।।
তিন দিন কেটে গেল ...
একদিন
সামনের বাড়িতে কান্নার শব্দ । বাড়ি ভিড়ে ভিড়ে ।। বেরিয়ে জানতে পারলেন
বাড়ির একমাত্র মেয়ে সুতপা কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ।। পুলিশে খবর দেওয়া
হলেও , অনাদিবাবু তারই বাল্য সহচরী , মিস প্রিয়মবদাকে ফোন লাগলেন ।। আসলে
প্রিয়মবদা হচ্ছেন একজন প্রাইভেট অনুসন্ধানী ।। অপরাধ অনুসন্ধান করে থাকেন
ছোট খাট আর সেই সূত্রে পুলিশ মহলে বেশ পরিচয়ও আছে ।। পুরো নাম প্রিয়মবদা ধর
।। মহিলা হলেও ভয় ডর নেই ।। তিন বছর পাহাড়ে ছিলেন ।। তখন অশান্ত পরিস্থিতি
ওখানে ।।
খবর পেয়েই স্পটে সোজা হাজির হলেন মিস ধর
।। মুখে সিগারেট টানতে টানতে সোজা হাজির ভিড়ের মধ্যে আর মুহূর্তেই ভিড় ঠেলে
সোজা ভিতরে ।। ভিতরে তখন পুলিশ আর হাজরা পরিবার । ধরকে দেখে একগাল হাসি
মুখে এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর বিজয় চৌহান ।। পুরোন পরিচয় মনে হল ।। ইতিমধ্যে
অনাদি বাবুও ঘরে হাজির ।। মিস ধর , আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন অনাদি বাবুই
তাকে ডেকেছেন ফোন করে এই কেসের ব্যাপারে ।। চৌহান স্যারের মুখ দেখে মনে হল
না তার কোন আপত্তি আছে ।।
ইতিমধ্যে খেয়াল করিনি
প্রিয় মানে মিস ধর আরও দুটো সিগারেট শেষ করে ফেলেছে আর শেষ কাউন্টার
অনাদিবাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে পরিবারের সামনে হাজির ।।
~ কি করে হল ব্যাপারটা ?
হাজরা
পরিবারে তিনটি মানুষ , বাবা, মা ও মেয়ে ।। বেশ কিছুদিন ধরেই কলেজ থেকে
ফেরার পথে আরিফ ও তার দল বল রাস্তায় ধরে যা তা বলত ।। আরিফ স্থানীয় পার্টির
ছেলে , তাই কারুর কিছু বলার জো নেই । দুদিন আগে আরিফের বন্ধু আসিফ
সুতোপাকে রাস্তায় ধরে প্রপোজ করে । নিকা করার হুমকি দেয় ।। কোনরকমে পালিয়ে
আসে সেদিন সুতপা ।। ও বলেছিল , ফল ভাল হবে না ।। নিখোঁজের দিন কলেজে বেরোয়
মেয়েটি দুপুর বারোটায় । রোজ বিকেল পাঁচটার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসত । সেদিন
আসেনি দেখে সন্দেহ হয় । খোঁজ শুরু হয় কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায় নি । তখন
পুলিশে খবর দেওয়া হয় ।।
~আপনি কি করেন ? মিস্টার হাজরাকে প্রশ্ন ধরের ।।
~আমি একটা দোকান চালাই । ওই মিষ্টির দোকান ।।
~বাড়িতে তিনজন ছাড়া আর কেউ ?
~না , আর কেউ নেই । তবে সকালে কাজের মাসি আসে ।।
ওরা বলে চলেছে আর অনাদি বাবু ডায়েরিতে নোট করে চলেছে ।।
~ কোন ফোন এসেছিল ? মানে টাকা পয়সা চেয়ে ...
~ আজ্ঞে , না তো ।।
~ মেয়ের কোন ছেলের সাথে চক্কর ছিল না তো ? পালিয়েছে দেখুন ।।
~ মেয়ে আমার খুব ভদ্র । ওসব কিছু ছিল না ।।
এবার বেশ ব্যঙ্গ স্বরে ইন্সপেক্টর চৌহান বলে উঠলেন , ভদ্র !! তাহলে গেল কোথায় ?
মিস প্রিয় সিগারেটে টান দিতে দিতে ইন্সপেক্টর কে বেশ ধমকিয়ে বলে উঠল , সেজন্য আমরা আছি ।।
এটুকু বলে অনাদিবাবুকে সঙ্গে নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মিস ধর ।।
রাত কেটে সকাল হল...
একটা
গরম চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে প্রিয় বলতে শুরু করল । অনির সাথে দেখা
প্রায় বছর তিনেক পর । বেশ পাল্টে গেছিস তুই অনি , প্রিয় বলে চললো , সেই
কলেজের বোকা ছেলেটা আজ আমার পাশে বসে কেস সলভ করছে ।। কত পুরনো কথা যে
সেদিন চায়ের ঠেকে আদান প্রদান হল খেয়াল করে নি দুজনেই ।। চা খেয়ে ,
সিগারেটের ধোয়া হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে উঠে পড়ল প্রিয় ।। চল , কলেজটা একবার ঘুরে
আসা যাক ।। অনাদিবাবু , গাড়ি বার করবে বলায় বেশ রেগে গিয়ে প্রিয়র জবাব ,
চল না হেঁটেই যাব ।। ভালোবাসার দিনটা একবার ফিরিয়ে আনাই যাক ।। বেশি দূর তো
নয় মদনপুর কলেজ অফ আর্টস ।। হেটে আধ ঘন্টা লাগবে , আর এখনও অনেক সময় বাকি
।। হাতে হাত ধরে ঠিক চলে যাবো ।। তখন তো ঠোটে ঠোট রাখতিস , আর এই কদিনে
হাতে হাত টাও রাখতে পারছিস না ।।
ভাগ -২
থানার ভিতর ...
ইন্সপেক্টর
চৌহান বসে আছেন ।। বাইরে একটা গাড়ি এসে দাড়ালো ।। লাল রঙের স্কর্পিও ।।
গাড়িটি থামতেই সবাই উঠে দাঁড়াল , কোন বড় হস্তি মনে হয় ।। গাড়ি থেকে নামলেন ,
একজোড়া বুট আর কালো কোট গায়ে একজন উকিল ।। প্রিয় ও অনাদিবাবু ভিতরেই ছিল
তখন ।।
কেমন চেনা লাগছে না গাড়িটা ? প্রিয়মবদার মুখে
একটা প্রশ্নের ভাঁজ ।। ওর আবার এসব মুখস্থ , মানে বড় বড় সেলিব্রিটিদের
গাড়ির নাম , নম্বর ইত্যাদি ।। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে
উঠে দাঁড়িয়ে বললো ; ম্যাডাম আসেননি ।।
~ ভিতরে ...
ততক্ষনে
অনাদিবাবুও বুঝে গেছেন , এ তো মন্ত্রীসাহেবার গাড়ি ।। ওদের ছেলেকে পুলিশ
এরেস্ট করেছে বলেই কি এই আগমন !! মন দিয়ে কথপকথন শোনার চেষ্টা করতে লাগলেন
তিনি ।।
~ আরিফ ও আসিফ কে কোন সাহসে এরেস্ট করলেন ? উকিলবাবুর প্রশ্ন ।।
~ পুলিশের মনে হয়েছে তাই ধরেছে ।। বেশ জোর গলায় বলে উঠল প্রিয় ।।
এবার একটু বাঁধা দিয়েই উকিল বাবুর প্রত্যুত্তর ; " জানেন না , ওরা আমাদের ছেলে "।।
~ বউয়ের গর্ভের না কি ইললেজিটিমেট ? প্রিয় বলে উঠল ।।
এবার একপ্রকার রেগে গিয়ে সজোরে এক থাপ্পড় কষে দিলেন উকিল বাবু ।।
~" বেল টা করুন "... উকিল বাবু বলে উঠলেন ।।
মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছিস শালা , প্রিয় চেঁচিয়ে উঠল , এরেস্ট করুন একে এক্ষুনি ।।
পরিস্থিতি
বেশ গরম দেখে অনাদিবাবু , মিস প্রিয়মবদকে ওখান থেকে টেনে সরিয়ে বাইরে নিয়ে
এল আর একটা ট্যাক্সি ডেকে জোর করে তুলে নিয়ে চলে গেল । যদিও কাজটা এত সহজ
ছিল না , তবু তিনি সেটা বেশ সফল ভাবেই করলেন ।।
ঘন্টা
খানেক পর ট্যাক্সি থামল একটা চায়ের দোকানে ।। মিস প্রিয় তখনও রাগে ফুসছেন
।। কিছু না বলে আগে দুটো চা ও একটা সিগারেট এর অর্ডার দিলেন অনাদিবাবু ।।
~ মাথা ঠান্ডা কর প্রিয় , অনাদিবাবু বললেন ।।
~
চুপ করে থাক , নপুংসক , প্রিয় বলে চললো , তোদের মত লোক থাকলে দেশে অপরাধ
আরও বাড়বে ।। শালা , দুটো ক্রিমিনালকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল , কিনা ম্যাডামের
কাছের লোক ওরা ।। থু...
একটা সিগারেট মুখে ধরিয়ে , প্রিয় বলল , ভয় পাস ?
~ না , আস্তে করে অনাদিবাবু বলে উঠলেন , তবে তোর জন্য ভয় হয় ।। তোর যদি কিছু হয়ে যায় ...
~
ধুর পাগলা , কিসসু হবে না ।। আমায় ছুঁয়ে দেখাক , শালাদের খালাস করে দেব না
।। আর শোন আমাকে ভালোবাসিস তো , জানি ওগুলো ভালোবাসায় হয় ।। কিন্তু বস ,
আমি এই প্রজাতির ।। তাই কেয়ার দেখালে আসতে পারেন আপনি ।।
~ না , না ।। তা নয় ।। কাছে টেনে নিয়ে , চল কোথায় যাবি চল ।।
প্রিয় এবার একটু শান্ত হয়ে বলে উঠল , তোদের পাড়ার পিছনেই ওদের পার্টি অফিস না ?
~ হ্যা .. কিন্তু আজ তো বন্ধ আছে ।।
~ তাতে কি বস , ওদিকে যেতে মানা নাকি ?
~ বেশ চল ।।
যদিও
এই ঝামেলার পর , ওদিকে যেতে চাইছিল না অনাদিবাবু , তবু প্রিয়মবদাকে এই
মুহূর্তে না করার ক্ষমতা তার ছিল না , আর না করলেও প্রিয় শোনার মেয়ে নয় ।।
সুতরাং , হাঁটা লাগালো ওরা , তবে ঘুরপথে ।।
বাড়ি
ফিরতে আজ বেশ রাত হবে মনে হচ্ছে অনাদিবাবুর ।। প্রিয় কিন্তু নানা পুরোন
গল্প জুড়ে দিয়েছে , ওদের ভালোবাসার ।। এ রাস্তা , সে রাস্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে
।। কিন্তু ঘুরে ফিরে একটা জায়গায় ফিরে ফিরে আসছে ।। যেন একটা চক্রের মধ্যেই
ঘুরছে ওরা দুজনে ।। মনে হচ্ছে , কিছু মাপতে চাইছে প্রিয় কিন্তু পারছে না
।। আবার হয়ত প্রিয়মবদা কারুর অপেক্ষা করছে ।। সিগারেটের ধোয়া , ভালোবাসার
গল্প সব মিলিয়ে অনাদিবাবুর মনে হচ্ছে এ রাত তোমার আমার ।। কিন্তু এই তুমি
টা কে জানে না দুজনেই ।।
হটাৎ প্রিয়র নির্দেশ , ঝুকে
যা অনি ।। কোন রকমে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল ওরা ।। সেই লাল স্কর্পিও ...
জোরে বেরিয়ে গেল ওখান দিয়ে ।। মিস প্রিয়মবদার মুখে একটা বড় হাঁসি ।। সমানে
বলে চলছে , ইউরেকা ইউরেকা পাগলের মত ।। অনাদিবাবু বুঝতেই পারছেন না , কি
খুঁজে পেল প্রিয় এবার ।। দুদিন কেটে গেলেও হাজরা পরিবারের মেয়ের যখন কোন
খবর পুলিশ জোগাড় করতে পারে নি , তখন এই যুবতী কি এমন পেয়ে গেল , অনাদিবাবু
ভেবে চললেন ।। আর বিশেষ কোথাও গেল না ।। অনাদিবাবুর বাড়িতে বসে দু কাপ কফি ,
কিছু সিগারেট , তারপর বাড়ি ।। যাওয়ার আগে বলে গেল শুধু , ওর ঘরটা খুব গরম ,
তাই ছাদে ঘুমানটাই শ্রেয় ।।
ভাগ - ৩
ধুর
ছাই .... অনাদিবাবু একবার এপাস একবার ওপাশ করে চলেছে বিছানার ওপর ।। প্রিয়
যে হটাৎ কেন ছাদে ঘুমাতে বললো কে জানে !! কোন ব্যাপার আছে না কি জাস্ট
এমনি কিছুই বুঝে উঠে পারছেন না তিনি ।। এরই মধ্যেই হটাৎ সেই শব্দ , কিছু
ভাঙছে কেউ ।। দৌড়ালেন তিনি ছাদের দিকে ।।
যতক্ষনে
পৌঁছালেন ছাদে , ততক্ষনে একটি গুলির শব্দ , আরো দুটি ।। ছাদে গিয়ে দেখেন
রাস্তায় পুলিশের ছয়লাপ ।। ভিড়ে ভিড় ।। নীচে এলেন দৌড়ে ।। এ সব কি হচ্ছে
পাড়ায় .... চিৎকার করে উঠলেন তিনি ।।
ততক্ষনে পথ আটকেছেন ইন্সপেক্টর চৌহান ।
~ ওদিকে যাবেন না ।। প্রাণ সংকট হতে পারে ।।
এদিকে প্রিয়র ফোন লাগছে না ।। সুইচ অফ বলছে ।। অনাদিবাবুর মনে কেমন একটা অস্থির ভাব ।।
~ জানেন কিছু দিন আগেও এই ভাঙা ভাঙ্গির শব্দ পেয়েছিলাম ।। পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললেন অনাদিবাবু ।।
এক
লেডি ইন্সপেক্টর দূর থেকে বলে উঠল , সব জানি আমরা ।। তুমি পিছনের পাড়ায়
যাও একবার ।। এই শুনেই অনাদিবাবু দৌড়ালেন পিছনের গলির দিকে ।। ওদিকটায় বেশ
খালি ।।পার্টি অফিসের গা ঘেষে চলে গেছে একটা সরু গলি , তার ফাঁক দিয়ে
পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বাড়িটি ।। হটাৎ ছাদের ওপর থেকে কেউ একটা কিছু ছুড়ল
তার দিকে ।।
কোন রকমে সরে গেলেন অনাদিবাবু ।।
অন্ধকারের জন্য তাকে কেউ দেখতে পাই নি ।। আস্তে আস্তে আবার এগোচ্ছেন তিনি
।। প্রায় বাড়িটার পিছনে হাজির ।। সেখানে জানলার দুটি রড ব্যাকানো ।। তার
ফাঁক দিয়ে তিনি হাজির হলেন ভিতরে ।। বেশ অন্ধকার ঘর ।। খুঁজে খুঁজে পকেটের
দেশলাই জ্বালালেন অনাদিবাবু ।। গুলির শব্দ প্রায় থেমে এসেছে দেখে দরজা খুলে
দিলেন ভিতর থেকে ।।
অবাক কান্ড ।। লড়াই তো চলছিল
বেশ খানিকটা দূরে ।। আর এর সামনের বাড়িটি তো তার চেনা মনে হচ্ছে ।। হটাৎ কে
পিছন থেকে এসে তার মাথায় থাপ্পড় মেরে বলে উঠল ,আরে পাগল , এটা চিনিস না
তোর নিজের বাড়ি ।। আর এটা হাজরার বাড়ি ।।
অনাদিবাবু মাথা চুলকাচ্ছেন ... প্রিয় তুই কোথা থেকে ....
প্রিয়
বলে উঠল , ওরে সব বলছি আগে সিগারেট দে ।। এদিকে ইন্সপেক্টর পাঁচটা আসামিকে
বেঁধে এনেছে ।। আসিফ , আরিফ , মি. হাজরা , মিস.ঘোষাল বা মিসেস হাজরা ও
একজন নতুন , নাম , পাণ্ডু ।।
~ দেখবেন , যেন ঠিক করে বেঁধে রাখা হয় ।। প্রিয় বলে উঠল ।।
অনাদিবাবু তখনও ভাবছেন আর এরই মধ্যে সুতপা হাজির ।। প্রিয় ওকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলল , বল তো বাবু স্টোরি টা কি ।।
বাচ্চা
টি কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল , ওরা যুবতী মেয়েদের ধরে পাচার করে দিত ।।
এরা আমার আসল বাবা মা নয় ।। আমি অনাথ ।। আমাকে সেদিন রাতে জোর করে তুলে ওই
ঘরে বন্দি করে রেখেছিল , তবে দরজা দিয়ে নয় , পিছনের জানালা দিয়ে বের করে
পার্টি অফিসের ও পাশের গলি দিয়ে তুলে নিয়ে যায় ।। তারপর একটা আলমনিয়ামের
বাক্সে ভরে দেয় ।। শুধু স্বাস্ নেওয়ার দুটো ছিদ্র ছিল ।। সেদিন রাতে কাকু
ছাদে চলে আসে তাই নিয়ে যেতে পারে নি ।। পরদিন আমার হারিয়ে যাওয়ার নাটক করা
হয় , যাতে কেউ সন্দেহ না করে ।। তবে সেই রাতে আরিফ ও আসিফ ওই ঘরে ঢোকে ও
বাক্স খুলে আমার শরীর টাকে টেস্ট করতে থাকে ।।
~ মানে এককথায় ধর্ষণ করা হয় , প্রিয় বলে উঠল ।। তারপর বাচ্চা টিকে চলে যেতে বলে পুলিশের সাথে ।।
~ আচ্চা , এই জন্য কাঁচ ভাঙার শব্দ হত ; ওটা আসলে এলুমিনিয়ামের বাক্সের শব্দ !! ও তো আমি আগেও শুনেছি ।।
~
সেদিন যে গলিতে আমরা লুকিয়েছিলাম সেটি ছিল , হাজরা পরিবারের বাড়ির পিছন
দিক ।। আমার চোখে পড়ে ভাঙা রড ওয়ালা জানলা ।। ঠিক যেমনটা দেখে ছিলাম
হাজরাদের বাড়িতে ।। আর ওপাশের গলি দিয়ে গাড়িটি বেরিয়েছিল ।। লক্ষ্য করি ওই
গাড়িতে দুজন জেল ছাড়া পাওয়া মহারতি বসে আছে ।। ওপাশের বাড়িটি হল ওই বন্ধ
বাড়িটির পিছন দিক সেটা হিসাব করে দেখি ।। কলেজে জানতে পারি সুতপা নামে কেউ
পড়ে না ।। আমি হাজরা পরিবার কে এরেস্ট করাতে পারতাম মিথ্যে বলার জন্য
কিন্তু পুরো দল ধরা পড়ত না আর এত মেয়েও উদ্ধার হত না ।। ভাবতে পারছিস ৩৫ টি
যুবতী ।। সবাই অনাথ ।।
কাল ওই ঘটনা ঘটে গেছে বলেই ওরা আজ কিছু করতে পারে বলে আন্দাজ করেছিলাম ।। তাই পুলিশ নিয়ে হাজির ছিলাম ।। বাকিটা দেখলি তো ....
অনাদিবাবুর চোখ পড়ল কাঁধের দিকে , রক্তের দাগ ।।
~ ও কিছু নয় , একটা বুলেট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে ।। সিগারেটের ধোয়াঁর মত উড়ে যাবে ।।
হাসপাতালে তো নিয়ে যাওয়া হল কিন্তু অনাদি ভাবছেন , সিগারেট আর বুলেট কি এক হল !!
সমাপ্ত :---
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন