শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

কুমারী হালিমা খাতুন (মুক্তা)















সম্পূর্ন উপন্যাস
কুমারী
কুমারী ও কুমারী
দুই তালা থেকে উত্তর এল জি খালু জান। তোকে তো এখন আর দেখাই যাই না, কোথাই থাকিস দুই তলাই? না  খালুজান বড় সাহেব ডেকে ছিল। কি করছে তোর বড় সাহেব। বারান্দায় বসে আছে। তোকে ডেকে ছিল কেন? এসময় এসে প্রশ্ন করল খালাম্মা। মানে আফতাব চৌধুরীর স্ত্রী  আমেনা চৌধুরী। কুমারীর খালুজানের নাম আফতাব চৌধুরী । খুব বংশীয় ঘরের ছেলে। আফতাব চৌধুরী তার চাচাতো বোন আমেনা চৌধুরীকে বিয়ে করেন। আফতাব চৌধুরীর দুই ছেলে । মেয়ে নেই। বড়টার নাম রিয়াদ পড়ে দশম শ্রেনিতে। ছোটটার নাম ফরহাদ পড়ে অষ্টম শ্রেনিতে। আর এই কুমারী পড়ে সপ্তম শ্রেনিতে কুমারী দেখতে এক কথায় অপরুপা। পড়াশুনাও খুব ভাল। আফতাব চৌধুরী কুমারীর নিজের খালুজান না। কুমারী এক মাষ্টারের মেয়ে। তার আর কোন ভাই বোন ছিল না । তারা তিনটি প্রাণি খুবই সুখেই ছিল। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম কেউ বেশি দিন সুখে থাকে না। তাই কুমারীর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন হঠাৎ এক দিন কুমারীর মা মারা যায়। মাষ্টার সাহের কুমারীকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। তার পরের বছর কুমারীদের গ্রামে বন্যা হয়। বন্যার পানি কুমারীদের  ঘর বাড়ি সব গ্রাস করে তখন মাষ্টার সাহেব তার মেয়েকে নিয়ে আরো চিন্তুায় পরে যায়। একদিন কুমারীকে এক পরিচিত বাড়িতে রেখে মাষ্টার সাহেব শহরে যায় কিছু জিনিসপত্র কিনতে। পথিমধ্য এক দ্রুতগামী ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়ে সাথে সাথে  মাষ্টার সাহেব সেখানেই মারা যায়। কুমারীর জন্য তিনি কিছু করে যেতে পারেনি। তখন কুমারীর দূর অবস্থা দেখে কুমারীর এক দূর সম্পার্কের চাচা কুমারীকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। কুমারীর এই চাচার চার ছেলেমেয়ে। আবার কুমারীকে নিয়ে আসায় তার চাচি সন্তুষ্ট হন না। সে অহেতুক উপদ্রব মেনে নিতে পারল না । তাই সে কুমারীকে দিয়ে সমস্ত সংসারের কাজ করায়। এভাবে কুমারীর তিন বছর চলে গেল। তার বয়স এখন ৯ বছর। সেই সময় কুমারীর চাচার বন্ধু অর্থাৎ আফতাব চৌধুরী বেড়াতে আছেন। অনেক দিন পর বন্ধুর সাথে দেখা তাই কুমারীর চাচা বন্ধুকে অনেক খাতির যতœ করলেন। দুই বন্ধুর মাঝখানে কুমারী নাস্তার ট্রে হাতে নিয়ে গুটি গুটি পাঁয়ে টেবিলে রেখে চলে গেল। আফতাব চৌধুরীর মেয়েটাকে খুবই ভাল লাগল। মনে হল মেয়েটা খুুবিই ভদ্র কিন্তু আবার দুঃখ পেল কারণ মেয়েটার গায়ে ময়লা ও ছেড়া পোশাক। আফতাব চৌধুরী জিজ্ঞাসা করল বন্ধু মেয়েটি কে? কী নাম। ও ওই মেয়েটির নাম কুমারী। তোদের বাড়ি থাকে বুঝি। হ্যাঁ। তা মেয়েটিকে কি পড়াস? না বন্ধু মেয়েটি যে সংসারের আলাদা একটি বোঝা। তার উপর আবার পড়া! ওকে যদি আমি পড়াই তাহলে তো আমার স্ত্রীর গঞ্জনার  জন্য ও আমাদের বাড়িতে থাকতে পারবে না। আফতাব চৌধুরী আশ্চার্য হয়ে বল্লো কেন কেন মেয়েটি তোদের সংসারের বোঝা কেন। তখন আফতাব চৌধুরীর বন্ধু সংক্ষেপে কুুমারীর ঘটনা খুলে বল্লো। সমস্ত ঘটনা শুনে আফতাব চৌধুরী খুব দুঃখ করল। আর বল্লো এমন একটি মেয়ে আমার প্রয়োজন। তুই যদি কিছু মনে না করিস আমি মেয়েটিকে নিয়ে যেতে চাই ওকে আমি পড়ালেখা শিখাব। আফতাব চৌধুরীর কথা শুনে তার বন্ধু অনায়াসে খুশি মনে কুমারীকে দিয়ে দিলেন। সেই থেকে কুমারী আফতাব চৌধুরী আর আফতাব চৌধুরীর স্ত্রীকে খালা আর খালু জান বলে ডাকে, আর আফতাব দুই ছেলেকে বড় সাহেব ও ছোট সাহেব বলে ডাকে। এই ডাকে কেউ অখুশি নয়। বরং সবাই খুশি রিয়াদ ও ফরাদ আরো খুশি সাহেব ডাকায় । কুমারীকে আনার সাথে সাথে তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। কুমারী ৭ম শ্রেনিতে উঠা পর্যন্ত কোন দিন প্রাইভেট পড়েনি। কুমারীকে রিয়াদ নিজেই পড়িয়েছে। এখনও পড়ায়। কুমারী বল্লো বড় সাহেবের জ্বর তাই আপনাকে বলতে বলেছে। আমেনা বেগম বল্লো কি! রিয়াদের জ্বর তা আগে বলিস নি কেন? আমেনা বেগম তাড়াতাড়ি ছেলের কাছে চলে গেলেন।
(২)
ইদানিং আমেনা বেগম কুমারীর প্রতি রেগে রয়েছে। কারণ সে বুঝেনিয়েছে যে রিয়াদের এস,এস,সির  জন্য বেশি পড়াশুনার পরও কুমারীকে পড়াতে গিয়ে তার ছেলে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। তিনি ঠিক করলেন কুমারীকে অন্য কোথাও পড়াবেন। আমেনা বেগম রিয়াদের ঘরে গেল। রিয়াদের কপালে হাত দিয়ে দেখল এখনো বেশ জ্বর আছে। মায়ের হাতের ছোয়ায় রিয়াদ বিছানার  উপর উঠে বসল। আমেনা বেগম জিজ্ঞাসা করল তোর একটু জ্বর কমছে? কখন থেকে জ্বর আসল ? তোর সাথে আমার একটু কথা ছিল। কি কথা আম্মা! কুমারীর পড়ার বেপারে। কুমারীর পড়ার আবার কি হলো। না কিছু হয়নি, তবে আমি মনে করছি তোর সামনে পরীক্ষা তাই আমি কুমারীকে অন্য কোথাও পড়াতে চাই। একথা শুনে রিয়াদের মুখ মলিন হয়ে গেল। তোর সুবিধার জন্য বাবা! রিয়াদ তখনই বল্লো না-না আম্মা আমার পড়া পড়েও আমি কুমারীকে পড়াতে পারি। ও জন্য আমার কোন অসুবিধা হবে না। আর আমার তো সিলেবাস কমপ্লিট ।এখন  শুধু রিভাইজ দিব। আমেনা বেগমের মুখ কালো হয়ে গেল। কুমারীর ব্যাপারে তার ছেলের বাড়াবাড়ি তার পছন্দ হল না। তবুও আর কিছু না বলে তিনি নিরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রিয়াদ পড়ার টেবিলে বসে বইতে চোখ বুলাচ্ছে তখন ৩ টা বাজে। কুমারী তার রুমে ঢুকে চেচিয়ে উঠল । এখন ভরদুপুরে সাহেবের পড়া হচ্ছে! পড়া আর সময় নেই!  এখন একটু ঘুমালেও পারতেন রিয়াদ মিনমিনে কণ্ঠে বলল, জানিস তো সামনে তো আমার পরীক্ষা এখন আমার বেশি পড়তে হবে। তাই বলে কোন সময় অসময় নেই! পড়তে হবে! ওতো পড়ে খাবে কেডা। কেন তুই খাবি! কুমারী চোখ বড় করে রিয়াদের দিকে তাকাল রিয়াদ একটু ঠাট্টা করে বলল ওরে বাপরে ! আজকে যে পরী মাটিতে থাকবে না,  উপরে উঠে যাবে। কেন কেন উপরে উঠব কেন! কুমারীর সাথে একটু মস্কারা করলেই কুমারী কান্দার মত হয়ে যায়। এখনো কান্নার মত হয়ে সে নিচে নেমে গেল।
শুনছো রিয়াদের বাবা তোমার গুনধর ছেলের কথা! কেন কি হয়েছে রিয়াদের? আমি বললাম বাবা সামনে তোমার পরীক্ষা  কুমারীকে আর পড়িও না। আমি ওকে অন্য যায়গায় পড়াবো। নইলে তোমার ডিষ্টার্ব হবে, কিন্তু সে এ কথা শুনতে চায় না  আফতাব চৌধরী হেসে বলল ও এই আমার গুনধর ছেলের কথা! আরো বলে ওর সব পড়া কমপ্লিট। কুমারীর জন্য ওর কোন ডিষ্টার্ব হবে না। ওর যদি ডিষ্টার্ব না হয়ে তাহলে পড়াক না মেয়েটাকে অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা কোথায়! দেখবো ছেলের রেজাল্ট কেমন হয়। তারপর তোমার সাথে বোঝাপড়া হবে আমার। কপাট রেগে আমেনা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আফতাব চৌধুরী স্ত্রীর গমন পথের দিকে চেয়ে রইন।
(৩)
কিরে কুমারী তুই এখানে কি চাস? ছোট সাহেব খালা আম্মা আপনাকে ডাকছেন। কি জন্য? তা আমি জানিনা। তুই যা আমি আসছি। আমেনা বেগম রান্না ঘরে ছিল। ফরহাদ এসে জিজ্ঞাসা করল আম্মা আপনি আমাকে ডাকছেন? হ্যাঁ ডেকেছি। তোর কি এখন বিশেষ কাজ আছে? না নেই। তাহলে তোর খালা আম্মাদের বাড়িকে একটু যা তো। গিয়ে বলিস কালকে যেন আমাদের বাড়িতে চলে আসে। জোর দিয়ে বলবি কিন্তু। ঠিক আছে আম্মা আমি যাচ্ছি। এখনি যা নইলে আবার সন্ধা হয়ে যাবে। *পরের দিন দুই বোন পাশাপাশি বসে আছে। সলাপড়া করছে। আমেনা বেগম বলল তুই কিন্তু কুমারীর ব্যাপারে ভাবছিস নিলু? নিলু  আমেনা বেগমের ছোট বোন। কিন্তু ছোট হলে কি হবে বুদ্ধির ঢেকি। আমেনা বেগমের বাড়ি কিছু হলেই তার এই ছোট বোনকে ডেকে এনে পরামর্শে বসে। তার এই স্বভাবের জন্য আফতাব চৌধুরী একটু দুঃখ পান। কিন্তু তিনি কিছু বলেন না। আমি ইদানিং একটা জিনিস দেখছি সে হল কুমারীর প্রতি রিয়াদের একটু বাড়তি আকার্ষণ। এখন আমি তোকে ডেকে এনেছি এর উপায় আমাকে বল যাতে বাড়তি আকার্ষন কেটে যায়। উপায় একটা আছে বুবু। সেটা হলো রিয়াদের পরীক্ষা শেষ হলে তুই ওকে ভাইয়ার বাসায় পাঠায়া দে। ভাইয়ার ছেলে নেই, ভালই হবে। কি বলিস? ওখানে থেকে পড়াশুনা করবে। নিলুর কথা ই আমেনা বেগম খুশি হয়ে হেসে উঠল। তুই ভাল একটা উপায় বের করেছিস নিলু। জানিস আমি খুব টেনশনে ছিলাম। এখন একটু কুমলো। *কি রে কুমারী তুই হঠাৎ এই ঘরে! তোকে আমি আজ তিন দিন দেখিনি তুই কি আমার উপরে রাগ করিছিস। না বড় সাহেব রাগ করেনি । রাগ করবো কেন? তাহলে আসিস নি কেন? আমার পরীক্ষা তিনটি হয়ে গেল তুই খোজ খবর নিলি না। পরীক্ষা আমার কেমন চলছে। প্রথম দিন তোকে বলতে গেছি। বাবা, কুমারী বিবি একেবারে হাওয়া হয়ে গেছে। কুমারী বিষন্ন কণ্ঠে বলল। আপনার পড়ায় যদি কোন অসুবিধা হয় এই জন্য আমি আসিনি। রিয়াদ একটু রশিকতা করে বল, বাবাঃ এত মানুষ এল আর গেল, আর কুমারী বিবি বলে নাকি তিনি আসলে নাকি আমার পড়ায় অসুবিধা হবে। কি জন্য আসিনি তা কি আপনি জানেন? কি জন্য? খালা আম্মা আমাকে নিষেধ করেছে। বলেছেন তোর বড় সাহেবের পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুই ওঘরে যাবি না। তাহলে এখন আসছিস কেন? কুমারী চুপ করে রইল। ও -বুঝিছি তোর বড় সাহেবকে না দেখে আর বুঝি থাকতে পারিস না। না থাকতে পারবো কেন? এই তিন দিন কেমন করে ছিলাম। আপনার ঘরে আর আসবো না। কুমারী দ্রুত পায়ে ঘর থেকে চলে গেল। কুমারী ...........কুমারী ........শোন। কুমারী যে তার ডাক শুনবে না এটা রিয়াদ জানে তাই আর না ডেকে পড়ায় মন বসালো।
(৪)
ইতি মধ্যে রিয়াদের রেজাল্ট বের হল। রিয়াদ ফাষ্ট ডিবিশনে একটা লেটার সহ পাশ করল। আমেনা বেগম আফতাব চৌধুরীর সাথে আলাপ করে রিয়াদকে তার মামা বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। রিয়াদ প্রথম তার মামা বাড়ি যেতে চাইল না । কিন্তু তার আম্মার অনুরোধে বাধ্য হলো শেষ পর্যন্ত যেতে।রিয়াদ জানে কুমারীর থেকে সরিয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতি। মা দোয়া করেছেন । রিয়াদ ভাবল যাওয়ার আগেই কুমারীকে বলতে হবে। নাইলে সে না থাকায় এই ফাকে যদি তার আম্মা কুমারীকে বিয়ে দিয়ে দেয় । না না রিয়াদ আর ভাবতে পারে না! রিয়াদের যাওয়ার কথা শুনে কুমারীর মন খারাপ। সে মন খারাপ করে সেই সকাল থেকে রিয়াদের সাথে দেখা করেনি। সে ঘরে চুপচাপ বসে আছে। এদিক থেকে রিয়াদ কুমারীকে কয়েকটি কথা বলার জন্য তার ঘরে এল কুমারীর ঘরের দরজাই রিয়াদকে দেখে ধরমড় করে শুয়া থেকে উঠে বসল। বড় সাহেব আপনি আমার ঘরে? কেন কি মানা আছে নাকি? না  মানা থাকবে কেন? তোমার কী শরীল খারাপ কুমারী। না। তাহলে এ অসময় বিছানায় কেন? এই মধ্যে নিশ্চয় একটা কারণ আছে। নইলে কেউ এই অসময় শুয়ে থাকে নাকি? আমি চলে যাচ্ছি তা কি তুমি জান? জানি। তোমার পড়ার প্রতি খেয়াল রাখবে বুঝলে। আমি যেতাম না আম্মার পিড়াপিড়িতে যেতে হচ্ছে। কেন আপনি যেতেন না? কেন আবার তোমার জন্য! কুমারী আশ্চার্য হয়ে বলল আমার জন্য! আমি আপনার কে? আমার জন্য কেন যেতে চাচ্ছেন না। রিয়াদ ব্যাকুল কণ্ঠে বলল কেন তুমি যে আমার সব। তোমাকে নিয়ে আমি কত স্বপ্ন দেখি। আর তুমি বলছো আমার কে? কুমারী বিস্ময় নিয়ে বলল একি বলছেন বড় সাহেব। হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ঠিক বলছি। তুমি কি কিছুই বুঝনা কুমারী। আমি ঠিকই বুঝি কিন্তু আমার অত সাহস হয় না। কারণ আমাকে অনুগ্রহ করে আমারকে মানুষ করেছেন এর চেয়ে আর বেশি কি চেতে পারি। না না না ও কথা তুমি বলোনা।  তুমি কথা দাও আমাকে ছেড়ে তুমি অন্য কোথাও যাবে না। বল বল ! ঠিক আছে আমি আপনা জন্য আপেক্ষা করব। অনন্ত কাল এই আপেক্ষা করা যদি আমার মরণ ও ডেকে নিয়ে আসে তাতেও আমার কোন দুঃখ হবে না।
(৫)
এদিকে রিয়াদ চলে যাওয়াতে কুমারীর মন ভাল না। পড়ার মন বসে না। কোন কাজেও মন বসে না। ওদিকে রিয়াদেরও সেই অবস্থা। কুমারীর কথা চিন্তা করতে করতে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। তাই মামা প্রায় বলে ধীরে ধীরে তোর শরীর ভেঙ্গে পড়ছে কেন? শরীরের দিকে একটু যতœ নিবে। রিয়াদ চলে গেছে প্রায় এক বছর হল। এর মধ্যে রিয়াদ অনেক চিঠি পেয়েছে। কুমারীও কয়েকটি চিঠি দিয়েছে কিন্তু খুব সাবধানে। আমেনা বেগম ইতি মধ্যে কুমারীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আফতাব চৌধুরীর জন্য  পেরে উঠছেন না। তিনি বলছেন ছোট মেয়ে ও কেবল ৯ম শ্রেনিতে পড়ছে। এখন ওর বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। সেদিন বিকাল বেলা কুমারী সমনের বারান্দায় বসে আছে। তখন দেখে একটা লোক এদিকে আসছে। লোকটি কাছে এসে বলল তোমার নাম কি কুমারী? জ্বি আপনিকে? আমার সাথে রিয়াদের পরিচয় আছে আমি ওখান থেকে আসলাম। তোমার একটা চিঠি দিয়েছে রিয়াদ। কুমারী হাত বারিয়ে চিঠিটি নিল । আপনি বসুন একটু নাস্তা করে যান। না ঠিক আছে। আরেক দিন করব। আজ আমি আসি কুমারী চিঠিটা এনে সাবধানে পড়তে লাগল। প্রিয় কুমারী সর্ব প্রথম রইল তোমার জন্য আমার এক গুচ্ছ লাল গোলাপের শুভেচ্ছা। আমি এক প্রকার ভালই আছি। আশা করি তুমিও ভাল আছ । আমি খুবই চিন্তায় আছি কারণ অনেক দিন যাবত তোমার কোন পত্র পাইনা। তুমি কি আমায় ভুলে যাচ্ছ? আসলেই নিত্তান্তই এ তুচ্ছ মানুষটা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে। জানিনা এ শেষ কোথায় । যাহোক, আমার পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা ভালই হচ্ছে। পরীক্ষার পর আমি বাড়ি চলে আসব। কারণ তুমি ছাড়া আমার ভাল লাগে না তোমার শরীরের প্রতি যতœ নিবে। আর বাড়ি কথা জানিয়ে চিঠি দিবে। আর বিশেষ কিছু লেখলাম না।  “ইতি” “তোমার হতভাগা রিয়াদ”। চিঠি পড়ে কুমারী ভাল লাগতে লাগল। কারণ রিয়াদ পরীক্ষার পরে বাড়ি চলে আসবে। কিন্তু তার এই ভাল লাগা দীর্ঘক্ষন স্থায়ী হল না। কারণ পরের দিন সকাল বেলা বাড়ির কাজের মেয়েটা কুমারীর ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে চিঠিটা বিছানার উপর পেল। কুমারী চিঠিটা বেখেয়ালে বিছানার উপর রেখে দিয়েছে। কাজের মেয়েটা বুঝতে পেরে চিঠিটা সোজা গিয়ে আামেনা বেগমের হতে দিল। আমেনা বেগম চিঠিটা পড়ে মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। চিঠির কথা শুনতে পেয়ে ফরহাদ কুমারীকে একটা থাপ্পড় মেরে বলল, ছোট লোক কোথাকার আমার ভাইয়ার সাথে প্রেম করতে তোর লজ্জা করে না । তোর ভাবা উচিত এই দুনিয়াই তোর কেউ নেই। আমাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিস। এই কথা শুনে কুমারী ঝর ঝর করে কেঁদে দিল। ওমনি আমেনা বেগম গর্জে উঠলেন, বুড়ি মেয়ের আবার কান্না হচ্ছে। এভাবে সবার মন গলাতে চায়। কি কষ্ট করে ওকে এই কয়টা বছর মানুষ করেছি। তোকে আমি মেয়ের মত জেনেছি। আর তুই আমার কপাল খালি।অভদ্র মেয়ে! সেই সময় আফতাব চৌধুরী কথা বলে উঠল। আহা মেয়েটিকে আর বকো না। অল্প বয়সের মেয়ে আবেগে  না হয় একটা ভুলই করে বসেছে। তার জন্য এত বকা বকি কেন! এমনি বুঝাই দিলে তো হয়। তুমি চুপ কর, তোমার আসকারায় মেয়েটি আজ এত দূর, এখন তুমি সামলাও। সেই রাতে কুমারী আর ভাত খেল না। আফতাব চৌধুরী কত সাধলেন তবুও কুমারী ভাত খেলেন না সারা রাত কুমারী এপাশ ওপাশ করতে লাগল। দুই চোখের জল ফেলতে ফেলতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। তার পরের দিন সকাল থেকে কুমারীকে চোখে চোখে রাখা হল সে যেন চিঠি লেখতে না পারে আমেনা বেগম কুমারীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পরে লেগেছেন। কারণ রিয়াদ আসার আগে কুমারীকে বিয়ে দিতে চান।
(৬)
কুমারীকে দেখে পাত্রপক্ষের খুবই পছন্দ হয়েছে। বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে। আর মোটে দুই দিন বাকি। আফতাব চৌধুরী এ বিয়েতে রাজি নন। কারণ মনে মনে কুমারীকে তার পছন্দ। ছেলের সাথে বিয়ে হলে হোক ভালই মানাবে। কিন্তু তার স্ত্রীর এক রোখার মনোভাবের জন্য তিনি এ বিয়েতে বাধা দেননি। কিন্তু এপাশতে ওপাশতে অনেক কথা বুঝিয়েছেন, কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
বিয়ের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, কুমারীর শরীর ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ বিয়ে থেকে কি ভাবে রেহাই পাওয়া যায়। কুমারী ভেবে পাচ্ছে না। কারণ চিঠি লেখার কোন উপায় নেই। আবার পালানোরও কোন পথ নেই। এখন কি করা যায়। অনেক ভেবে চিন্তে কুমারী ঠিক করল দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিবে।
*কিরে মনা ত্ইু এখানে কি চাস? মনা আমেনা বেগমদের বাড়ির চাকরানী। খুবই বিশ্বাস্ত। মনা মুখ মলিন করে বলল খালাম্মা কুমারীকে পাওয়া যাচ্ছে না। কি বল্লি ! কখন থেকে। প্রায় আধা ঘন্টা। আমি উপরে যখন কাজ করছিলাম তখনও তার রুমে দেখে গেয়েছি। ফিরে এসে দিখি নাই। তা- আমাকে আগে বলিস নি কেন! আমি মনে করেছি যে বাথরুমে গেছে। কিন্তু অনেকক্ষন পরেও বের হতে না দেখে আমার সন্দেহ হয়।  আমি খোঁজা খোঁজি করি। কিন্তু কোথাও পায়নি। শুধু একটা চিঠি পেয়েছি তার বিছানায়। কই দে তো  মনা আমেনা বেগমের হাতে চিঠিটা দিল । তিনি চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। “প্রিয় খালাম্মা জান”, পত্রে আমার সালাম নিবেন। পর সংবাদ, আমার জন্য আপনাদের কোন ক্ষতি হোক তা আমি চাই না। তাই আমি পরের মেয়ে আপনাদের থেকে পর হয়ে গেলাম । আমার জন্য আপনাদের আর কোন অসুবিধা হবে না। ইতি হতভাগা কুমারী ।
কুমারীর নিখোঁজ হওয়া সংবাদ শুনে আফতাব চৌধুরী মাথায় যেন বাচ পড়ল। তিনি সব আত্মিয় স্বজনদের বাড়ি খোঁজ করলেন। কুমারীর চাচার বাড়িও খোঁজ করলেন। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। এদিকে বিয়ের দিন পাকাপোক্ত হয়ে আছে। মানসম্মানের ব্যাপার । এদিকে আমেনা বেগম আবিরাম কান্না কাটিতে ব্যস্ত  আছে। এখন তার সব রাগ গিয়ে পড়েছে তার বোন নিলুর উপর। তার জন্যই তো কুমারীর এত তড়ীঘড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করা হল। এত তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা না করলে তো আর সে পালাতো না। মানসম্মান ও যেত না। তার স্বামীরও অসুখটা বাড়ত না । আফতাব চৌধুরীর পুরানো অসুখটা বেড়ে গেছে। তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছে।
(৭)
খবর শুনে রিয়াদ বাড়ি ফিরল। সব ঘটনা শুনে সে খুবই ভেঙ্গে পড়ল। বাবাকে দেখে রিয়াদ আর সয্য করতে পারলো না। কেঁদে দিল। কুমারীর জন্য ও মন খারাপ, কোথায় গেল মেয়েটা । এই বয়সের মেয়ে ওর তো কোন আত্মিয় স্বজন নেই । রিয়াদ আর ভাবতে পারে না। রিয়াদ হসপিটাল থেকে বাড়িতে এসে কুমারীর শেষ চিঠিটা পড়তে লাগল। দুই চোখের আশ্রু সে আর ধরে রাখতে পারেনি। রিয়াদ এসে আবার সব জায়গায় খোঁজ করেছে। কিন্তু কোথাও পায়নি।
*তার দুই দিন পর আফতাব চৌধুরী হসপিটাল থেকে বাড়ি আসল । আমেনা বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছে। আফতাব চৌধুরী বসে আছে। তার দুই চোখ বুজা। দেখে মনে হবে সে গভীর চিন্তায় মগ্ন। এমন সময় আমেনা বেগম ঘরের ভিতর এসে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল। তার মুখ অশ্রুতে ভরা। স্ত্রীর আসার  শব্দে তার দিকে তাকালেন। কি হয়েছে তোমার মুখ মলিন কেন? তোমার তো মুখ মলিন হওয়ার কথা না? তোমার তো পথ পরিস্কার হয়ে গেছে। আমেনা বেগম ডুকরে কেঁদে বলেলন আরো বল আমার পেরাচিত্ত আমাকে করতেই হবে। রিয়াদ আমার সাথে কথাই বলছে না। বাড়ি খাওয়া দাওয়া করছে না। ছেলেটার চেহারার কি হালটা হয়েছে । এসবই তো  আমার জন্য। দেখ তুমি যে কাজ করছ তাতে ছেলেটা খুব দুঃখ পেয়েছে। এজন্যই কথা বলছে না । ও ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কিছু চিন্তা করো না। আমেনা বেগম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
(৮)
আফতাব চৌধুরী বিকালে বারান্দায় বসে একটা পেপার নাড়াচাড়া করছিলেন। এমন সময় কাজের মেয়ে এসে বলল, খালুজান একটা লোক আসছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চায়। আমি ড্রয়িং রুমে বসতে দিয়েছি। আফতাব চৌধুরীকে রুমে ডুকতে দেখে লোকটা সালাম দিল। কি বাবা তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না। আমার নাম রায়হান। আমি আপনাকে একটি সংবাদ দিতে এসেছি। কি সংবাদ বাবা? কুমারী নামে আপনাদের কি কোন মেয়ে ছিল। হ্যাঁ -হ্যাঁ বাবা ছিল। ও এখন কোথায়? তুমি কি তার সংবাদ নিয়ে এসেছো? হ্যাঁ আমি ওকে পেয়েছি।
সেদিন রাতে প্রায় নয়টার সময় আমি বাড়ি ফিরছিলাম। তখন কি যেন একটা আমার গাড়ীর সামনে পড়ল। আমি তাড়াতাড়ি ব্রেক কসে নেমে দেখলাম একটি মেয়ে। মেয়েটি গাড়ীর সাথে ধাক্কা খাওয়াই কয়েক জায়গায় কেটে গেছে এবং অজ্ঞান হয়ে গেয়েছিল। তাড়াতাড়ি আমি গাড়ীতে উঠিয়ে আমার বাসায় নিয়ে গেলাম । আফতাব চৌধুরী যেন গোগ্রাসে লোকটার কথা শুনছিল। কখন যেন আমেনা বেগম ও পর্দার ওপাশে দাড়িয়ে শুনছিলেন। মেয়েটার কাছ থেকে সব কথা জানতে পেরে আমি আপনাদের বাড়ি আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটা বলল আপনি যাবেন না, কারণ সে বাড়ি থেকে আমি চলে আসছি। আর আমি ও বাড়ি যাব না। দরকার হলে আমি আপনার বাড়ি থেকে চলে যাব। তবুও আপনি ও বাড়ি খবর দিবেন  না । তবুও আমি আসতাম কিন্তু কাজের চাপের জন্য এই চার দিন আসতে পারিনি। আমি দুঃখিত আমার দেরির জন্য আমি এখন উঠি। না -না একটু চা নাস্তা করে যান ।
(৯)
আমেনা বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরে খুবই অনুতপ্ত হয়েছেন। তিনি নিজে গিয়ে কুমারীকে বাড়িতে এনেছেন। কুমারী এ বাড়ি আসতে একে  বারে অনিচ্ছুক ।  তবুও আফতাব চৌধুরীর অনুরোধে এবাড়িতে এসেছে আজ সন্ধায়। রিয়াদ এসবের কিছুই জানে না।  রিয়াদ কুমারীর হারিয়ে যাওয়া থেকে বাড়িতে অনেক রাত করে ফিরে। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এদিকে কুমারী রিয়াদের পথ পানে তাকিয়ে আছে। আফতাব চৌধুরী ও আমেনা বেগম ঠিক করেছেন রিয়াদ ও কুমারের বিয়ে দিবে। ঘড়িতে যখন রাত দশটা বাড়ির সবাই যার যার ঘরে। কুমারী অস্থির ভাবে তার ঘরে পায়চারি করছে। এমন সময় দোতলার সিড়িতে পায়ের শব্দ হল। কুমারী সচকিত হল। ধীরে ধীরে সিড়ি বেয়ে রিয়াদের ঘরের সামনে এল। পর্দার ফাঁকে উকি মেরে দেখল রিয়াদ খাটে শুয়ে আছে । চেহারাই মলিনতা ভাব। খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠে কেমন যেন রোগাটে হয়ে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কুমারী আর দেখতে না পেরে দরজার সামনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। শব্দ শুনে রিয়াদ ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। মনে এক রাশ প্রশ্ন এল। কুমারী এত রাতে কোথা থেকে এলো। কোথায় ছিল এতদিন। রিয়াদ কুমারীকে এনে বিছানায় শুয়ে দিল। তার পর পানি এনে চোখে মুখে ছিটাতে লাগল। কিছুক্ষন পর কুমারী আস্তে আস্তে চোখ খুলল। রিয়াদ এক সাথে অনেক প্রশ্ন করল। এতদিন কোথায় ছিলে তুমি! কি করে বা এলে, কুমারী তার সব ঘটনা খুলে বলে। সব ঘটনা শুনে রিয়াদ একটু সস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। কুমারী জিজ্ঞাসা করল তুমি ভাত খেয়েছো? খেয়েছি। কোথায়? হোটেলে। আচ্ছা আমি না থাকায় প্রতি দিন কি তুমি এত রাত করে বাড়ি ফিরো। থাক ও সব কথা এখন। কেন থাকবে? তুমি আমার জন্য তিলে তিলে তোমার জীবন নষ্ট করে দিতে পারো না। ঠিক আছে বাবা মাপ চাচ্ছি। আর এমনটি হবে না। যদি তুমি পাশে থাক। কুমারী ঠাট্টা করে বলল, ওরে বাবা এখন পাশে থাকতে পারবো না। কয়েক দিন পর। রিয়াদ সলজ্জো হেসে কুমারীর চিবুক ধরে বলল, সত্যিই তুমি আর কয়েক দিন পর আমার বধু হবে তো? তোমার বধু হব না তো আর কার বধু হব। খালাম্মা রাজি হয়েছেন যে। দুজনেই হেসে উঠল।
(সমাপ্ত)














ভালবাসার কষ্ট
হালিমা খাতুন (মুক্তা)

আমার হৃদয়ে একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে
সেখানে নিয়েমিত রক্ত ক্ষরন হয়।
অহনির্শ না পাওয়ার বেদনা
আমাকে জজরিত করে।

জানি বাস্তব মেনে নিতে হবে,
কিন্তু সে বড় কঠিন
আমার অন্তরে নিয়মিত ব্যাথার ¯্রােত বইছে
সেই ¯্রােতে ডুব দিতে হয় মাঝে মাঝে
ইচ্ছে-অনিচ্ছেই ।

আমার মনে একটা কষ্ট আছে
ভালবাসার কষ্ট।
সে কষ্টের বেদনা আমাকে নীল করে দেয়,
হাহাকার করে উঠে আমার ¯œায়ু
চৈত্রের দুপুরের রোদের মত খা খা করে আমার ভিতরটা,
যেখানে পুড়িয়ে দেয় আমার অন্তর।

আমার বুকের ভিতর একটি আগ্নিয়ও গিরি লাভা আছে
যেখান থেকে সারাক্ষণ ব্যাথার লাভা ছড়ায়
সে ব্যাথায় আমি পাগল প্রায়।
আমি সহ্য করতে পারিনা তার বিরহ, বিচ্ছেদ
তাই মাঝে মাঝে তাকে স্বরণ করে,
 চোখের জল ফেলাই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন