বুধবার, ২৪ মে, ২০১৭

মোস্তাফিজ ফরায়েজীর গল্প অনুর বিয়ে


.















মোস্তাফিজ ফরায়েজীর গল্প
অনুর বিয়ে

অনুর বিয়ে হয়েছিল।
তার উপর আবার অনুর নাম্বারটা এক সপ্তাহজুড়ে বন্ধ।
বিয়ে তো অনুর হবেই। বয়সটাও কী তার কম! এ বছর তেইশ বছরে পড়েছে। আর দু'একবছর হলেতো অনু বুড়িই হয়ে যেত। তবুও আমি তার বড়বোন তনুকে মুঠোফোনে প্রশ্ন করলাম, অনুর কী বিয়ে?
কী হতচ্ছাড়া মার্কাই না প্রশ্নটা। সব জেনে শুনেও এরকম প্রশ্ন কী কেউ করে? আবার তনু আপুর উত্তরটাও কেমন বিদঘুটে, তুমি জানলে কীভাবে?
ভাবখানা এমন যেন আমি জানলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।
তা তো হবারই কথা। আমি হলাম অনুর বয়ফ্রেন্ড। প্রশ্নটা এখন, তাহলে অনুর কার সাথে বিয়ে হয়েছিল? হ্যা, দুবছর আগে, তার কম হবে না।
কার সাথে আবার! আমার সাথেই। কীভাবে? অতি গোপনে, চুরি করে।
আসল ব্যাপারটা হলো, তনু আপু যে বলল, অনুর বিয়ে! এখন কী হবে?
সেই শোকে এক গাছি দড়ি এনে গলায় ফাস দেব? না, অনুর বিয়ে বলেই কী দড়িতে ঝুলতে হবে আমাকে? আমি মরলে আমার বাবা যদি স্ট্রোক করে? বাবার শোকে আমার শোকে মা যদি বিশ খায়? তখন কী হবে? তাই ভাবছি, এখন কী হবে?
অনুকে কী আমি এত সহজেই ছেড়ে দেব?
আমার আর ওর বিয়ে তো আর সবার মত বিয়ে নয়। সাত বছর প্রেমের পরে দুবছরের বিয়ে। সাত বছরের প্রেম কী চাট্টিখানি কথা? কত স্মৃতি! কত কথা! কত সুখ! কত রাগ! তার কী আর হিশেব আছে! তাই ঠিক করলাম ওকে যদি ছাড়ি ছাড়ার মতই ছাড়ব।
অনুর বিয়েটা আবার দুদিন বাদেই। বুধবার, বৃহস্পতিবার তারপর বিয়েবার।
অনুর বিয়ের দাওয়াত দিতে নয়, বরং নিজের এই ঘোর বিপদের দিনে বন্ধু বান্ধবদের কাছে ডাকলাম শলা পরামর্শের জন্যে। তাদের আবার নানান কথা।
কেউ বলে, এই বয়সে এত ঝুট ঝামেলায় জড়াস না। যে যাবে সে চলে যাক। এ বয়সের ঝড়ে অনেকের জীবন বিপন্ন হয়।
কেউ বলে, বিয়ে কী যা তা জিনিস? তুলে নিয়ে আয় ওকে, দেখি কে ঠেকায়?
তাইতো! কথা কিন্তু মন্দ নয়, কত মেয়েকে কত ছেলে বের করে এনে দিব্যি সংসার করে চলেছে। আমিও না হয় ওদের দলের একজন হয়ে গেলাম। এতে কী এমন ক্ষতি!
তাই সেদিন রাতে তনু আপুকে আবার ফোন দিলাম, বললাম, ‘অনু- বিবাহিতা!’
‘কী যা তা কথা! বড় আপু হয়েও জানি না। তোমারই বা কেন এত মাথা ব্যাথা?’
‘কাবিনটা পাঠিয়েছি, একদম খাসা।’
তনু আপুর ওপাশের ঢোক গেলার শব্দ এপাশেও শুনতে পেলাম।
তারপর অনুর সাথে কথা। অনুতো ফোনই ধরবে না। শেষমেশ ফোনটা ধরে বলে কী জানেন?

কেএএ? কেএ আপনি?
কোন রিংকু?
চিনতে পারছি নাতো!
আপনি এখানে ফোন দিয়েছেন কেনো?
আশা করি আর ফোন করবেন না।

কী হল? যে অনু আমাকে ছাড়া এক মূহুর্ত থাকতে পারত না, সে একি বলল! অনুই কথা বলল তো! নাকি অন্য কেউ।
নাহ, অন্য কেউ তো হতেই পারে না। নয় বছরের অতি আপন কণ্ঠস্বর, চিনতে ভুল হওয়া অসম্ভব প্রায়। এই নয় বছররে মাঝে বিশ্বাসঘাতকতা বলতে প্রেমের পঞ্চম বছরে। ও তখন রাজশাহী, আমি ঢাকাতে। ওকে পাবার জন্য কিই না করেছি আমি। গাধার মত খেটে টিউশনি করিয়ে টাকা জমিয়ে জমিয়ে ওর জন্য তেল-নুন থেকে শুরু করে নোকিয়া মডেলের নতুন মোবাইলফোন পর্যন্ত কিনে দিয়েছিলাম সেবছর।
আর ওই বছরেই ওর গড়িমসি, পড়ার বড্ড চাপ, রাত ১১টার পরে আর কথা নয় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। ওকে বড্ড বিশ্বাস করেছিলাম। তাই তখনকার দিনে একটার বদলে এগারোটায় রাত শেষ হত আমার। অথচ একদিন সোয়া বারোটায় ফোন দিতেই বিপত্তি। অপর প্রান্তে অনুর হাতের নতুন নোকিয়া ফোনটি তখন ওয়েটিং-এ, সেই সোয়া বারোটা থেকে পৌনে তিনটা। ওয়েটিং আর ওয়েটিং। তখনও আমি ভেবেছিলাম, এখন কী হবে?
আমি কী ওকে ছেড়ে দেব? নাহ, সেসময়ও ওকে ছেড়ে দেওয়াটা আমার হয়ে ওঠে নি। ছেড়ে দেওয়া জিনিসটা অত সহজ নয়।
ওই বরং ওর দ্বিতীয় প্রেমিককে ছেড়েছিল। ওর কাছে হয়তো ব্যাপারটা সহজ ছিল। হয়তো সহজ বলেই ও আজ আমাকে বলতে পেরেছে, কোন রিংকু? আজ যেন সব কিছু বৃষ্টির পানির মত পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেসময়। অতি স্বাভাবিক, তাই না? প্রেম তো! ঝড় তো থাকবেই। যাই হোক সেসব ঝড়-ঝাপটার দিন পার করে দু'বছর আগে একদিন হঠাত আমি ফোন করে অনুকে বলেছিলাম, ‘বড্ড তাড়না, বড্ড কামনা। আমায় তুমি রক্ষা করো। আমায় তুমি বিয়ে করো।’
অনু বলেছিলো, ‘তোমার মত পুড়ে পুড়ে আমিও মরছি। আমি ঢাকায় আসছি।’
এরপর অনু ঢাকায় এসেছিল। আমরা ফার্মগেটে কাজী অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর একসাথে একঘরে রাতের পর রাত কাটিয়েছি। অতি নিরবে, অতি নিশ্চুপে। কেউ শুনতে পায় নি সেসব রাতের ফোঁসফাঁস শব্দ। অথচ গত দুটি বছর বছির আংকেলের ফ্লাটে কত রাত সাপের ন্যায় দুজন শুয়েছি তা তো অনু ছাড়া আর কারো জানারও কথা নয়। সেই অনু- আমার অর্ধাঙ্গী, মাত্র সপ্তাহখানেকে আমায় ভুলতে বসেছে। এ যেন এক অবাক বিস্ময়!
নারী তো!
সেদিন রাতেই রওনা দিলাম। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল সাতটা। আটটায় রশীদমামাকে ঘরে এনে দরজার খিড়কি এটে দিলাম।
মামা অভিজ্ঞ মানুষ। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। এলাকাতেও ভালো দাপট। আমার সাথে মামার বেজায় ভাব। মামাকে সব খুলে বলতেই মামার উক্তি, ‘যদি সে না চায়, তবে কীভাবে হবে? যদি সে চায়, তবে ঠেকাবে কে?’
সে। নারী। কোমল মনের অধিকারিণী। সব প্রেমের সঞ্জীবনী। সে। সম্পর্কের সুতো। সে যদি ছিঁড়ে যায় তবে এ আমি একাকার।
তাই মামাকে বললাম, ‘তার সাথে কথা বলার উপায় নেই। ফোন বন্ধ।’
মামা বলে, ‘তবে যাই বিকালে। অনুর ভাষ্য শুনে আসি।’
যেতে তো আর ঘন্টা পাঁচেক লাগবে না। অনুর বাড়ি আর আমার বাড়ির দূরত্বই বা কতটুকু। সাত মিনিটের পথ। একি গ্রামে বসবাস।
বিকেলটা যেন আর আসে না। মামা আর দু’তিনজন মিলে বিকালেই অনুর বাড়ির পথে যাত্রা করল। ফিরে আসতেও দেরি হল না।
মদ খাই। গাঁজা খাই। হিরো খাই। নেশা করি। এই আমি। বখাটে, ইভটিজার, উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে।
এই ছিল অনুর কাছে আমার বর্তমান পদবী।
সপ্তাহখানেক আগেও ওর কাছে আমার পদবী ছিল- প্রতি মূহুর্তের নিশ্বাস, প্রতি দিনের দীর্ঘশ্বাস।
মামা বলল, ‘ছাড়, ডাইনিটাকে।’ এছাড়া নানা উপদেশ, সান্ত¡না।
তবু।
এসব পদবী পেয়েও থেমে থাকাটা হল না। ছেড়ে দেওয়াটা হল না।
অনুর কাছের এক বান্ধবী নিলা গোধূলি বেলায় আমার হাতে একটা চিরকুট গুঁজে দিল।
সেই চিরকুটের উপরেই রাতে পড়লাম। কয়েকটি সংখ্যা দেওয়া ছিল চিরকুটে। ফোনে ডায়াল করতেই অনুর ভাবী দ্বিতীয় বরের কন্ঠস্বর। মোটা, ঢেমশাটে। বয়স্ক লোক বটে। শুনেছি গাঁটে টাকা আছে। এই টাকাওয়ালা ঢেমশাটে লোকটা সব শুনে যা বলল তাতে তো চক্ষু ছানাবড়া হবার বদলে মন মনমরা হয়ে গেল। ঢেমশাটে লোকটার যে কোনকিছুতে অরুচি নেই বুঝলাম। তার একজন হলেই হল, অনু হলে তো কথাই নেই। রূপে রূপবতী, হাসিতে মায়াবতী, শরীরে জোশ। তার এই বয়সে আর কী চাই? অনু একটা না দশটা বিয়ে করেছে একথা তার কানে গেলে ক্ষতি কী? সেও তো আগে দুইটা করেছে।
অরুচি তো অনুরও নেই। তা না হলে...। ভাবা যায় না।
নারী তো!
পরিবার আর টাকা, এইতো সব। আর কী চাই? প্রেম তো নারীর চারপাশে ঘুরঘুর করে মৌমাছির মত। চাইলেও, না চাইলেও। সেখান থেকে এক খামচা প্রেম যখন তখন নিয়ে নিলেই প্রেমের চাহিদাও মিটে যাবে অনুর। আমার ভালোবাসারই বা তার দরকার কীসের?
ওর বিয়েবার আর আমার শোকবার পার করে আবার ঢাকার পথে। সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা, হাতে ডিভোর্স লেটার। এই অকালে অনেকের অগোচরে যে ঝড়টি বয়ে গেল তা বোধহয় সুনামির চেয়েও কম নয়।
কোমল হৃদয় আমার। কোনদিন মুখ দিয়ে ধুয়াও ফুঁকি নি। সেই আমি আজ নিজেকে বড্ড কলঙ্কিত বোধ করতে লাগলাম। পুরুষের কলঙ্ক, বড্ড কঠিন জিনিস।
যাত্রাপথে ট্রেনের হুইছেলের সাথে সাথে স্মার্টফোনের টাচ স্ক্রিনে ভেসে আসতে লাগল নানান ছবি। নানান ছবি মানে নানান স্মৃতি, নানান ঘর, নানান ভালোবাসা, বছির আংকেলের ফ্লাট। ছবিগুলো একটি মৃত পাখির আর একটি উড়ন্ত চিলের।
আমার আবার ফেসবুক আইডি আছে, ইউটিউবে একটা জনপ্রিয় চ্যানেলও আছে। তাই ভাবছি, এখন কী হবে?

-মোস্তাফিজ ফরায়েজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইলঃ ০১৭৩৭-৩৭৭০৯০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন