বুধবার, ২৪ মে, ২০১৭

যাপিত জীবন > > নিশাদ আনোয়ার




















 যাপিত জীবন
>
> নিশাদ আনোয়ার
>
>
>
>
>
>           কেনই বা সত্য কথা বলতে গেল আর কেনই বা টিফিন বক্সের ঢিল খেয়ে কপাল
> কেটে নিল । বসে বসে নিরস বদনে ভাবছে আর কাজ করছে আবেদ আলী । অফিসে সে কখনো
> মন খারাপ করে থাকে না । বিষয়টি খেয়াল করে পাশে বসে থাকা আলাবক্স । পান খাওয়া
> দাতে তার আয়রণ পরেছে কয়েক পরত । হাসলে মনে হয় একটি দাতও নেই । সে আবার হাসি
> ছাড়া কথা বলতে পারে না । বেশ কয়েকবার ডাকে আবেদ আলী কে । সে শুনতে পায় না ।
> পানের রস আর মুখের লালা মিশে কেমন একটা জেলি তৈরী হয় মুখের ভেতর,আলাবক্স সেটা
> গিলে নিয়ে গলা পরিস্কার করে একটু জোড়ে ডাক দেয় -‘ও আবেদ ভাই মন খারাপ নাকি ?’
> না তো ভাই ।        ‘ আপনার কপালে কি হয়েছে ? অ্যা, ভাবী কি কপাল ফাটিয়ে
> দিয়েছেন ?’ রসিকতা করে আলাবক্স কিন্তু আবেদ আলীর মন ভালো হয় না বরং তার কথা
> শুনে কিছুটা আশ্চর্য হয় । তার বৌ যে কপাল ফাটিয়েছে এটা সে কিভাবে জানলো ?
> তাহলে কথাটা  বৌ-ই ফোন করে বলেছে । উত্তর না পাওয়ায় নিজের চেয়ার ছেড়ে আবেদ
> আলীর টেবিলের সামনে বসে আলাবক্স । গভীর ভাবে লক্ষ্য করে কেটে যাওয়া স্থানটির দিকে
> । আবেদ আলী অসস্থিবোধ করে । ‘ আচ্ছা ভাইসাব, ভাবী কি টিফিন বক্স দিয়ে ঢিল
> ছুড়েছিল ? আহা ! এভাবে কেউ স্বামী কে মারে ?’
>
> কোন উত্তর দেয় না আবেদ আলী । বরং তার মনে সন্দেহ দানা বাধে । টিফিন বক্স দিয়ে
> কপাল কেটেছে এটা শুধুমাত্র বৌ আর ছেলেপুলেরা জানে । আলাবক্স জানবে কিভাবে ।
> চশমার উপর দিয়ে সন্দেহজনক চোখে তাকিয়ে থাকে আলাবক্সে’র দিকে । পান খাওয়া ঠোট
> দুটি খয়েরি রং ধারণ করেছে । কথাগুলো জোর গলায় বলায় আরো অনেকে ভীর করে আবেদ
> আলী র টেবিলের চারপাশে ।
>
>  সন্দেহের চারাগাছ বাড়তে শুরু করে হরিণী বেগম কে বিয়ের পর থেকেই । নামের সাথে
> যথেষ্ঠ মিল আছে তার । এক মুহূর্ত সে স্থির হতে পারে না । সদা ছটফটে । হরিণী র
> সাথে আবেদ আলী র দাম্পত্য জীবনে দুই মেয়ে আর এক ছেলে । কিন্তু আবেদ আলী
> চেয়েছিল একটা বাচ্চা নিয়ে আর নেবে না । তাকেই ভালোভাবে মানুষ করবে । হরিণী কে
> বলায় সেও রাজি হয়েছিল ।
>
> প্রথম সন্তনের বয়স দু’বছর হবার পূর্বেই সে ফের কন্সিভ করে । সাথে তার গলায় একটি
> স্বর্ণের চেইন দেখা যায় ।  আবেদ আলী চেইনের কথা বলায় বলেছিল - বাবা দিয়েছে ।
> অথচ বাবা’র নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা । যাক সেটাও মেনে নেয়  । কিন্তু নিয়মিত
> কনডম ব্যাবহারের পরেও যখন তৃতীয় বার কন্সিভ করে হরিণী বেগম এবং হাতে দুটি সোনার
> বালা দেয়া শুরু করে তখন সন্দেহ না করে উপায় থাকে না । প্রশ্ন করলে উত্তর একটাই ‘
> বাবা দিয়েছে ’ ।
>
> তৃতীয় বাচ্চা যখন ছেলে হল শুনে আশ্বস্থ হয় আবেদ আলী । পরম আনন্দে বাচ্চা কে
> কোলে নিয়ে আৎকে ওঠে সে । বাচ্চাটার চেহারা হুবহু একই ফ্লাটের দোতলায় বসবাসকারী
> ভদ্রলোক সোবহান খানের মত । হাসবে না কাঁদবে স্থির করতে পারে না ।
>
>
>
> “ হেই ভাই, বক্স সাব রে কোনো দিন দেখেন নাই” । একজন ধাক্কা মেরে বলে । আবেদ
> আলীর ধান্দাটা কেটে যায় । কি বলবে সে ? বলবে যে, আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গে বৌয়ের
> চেচামেচিতে । গতকাল বেতন হয়েছে । সব টাকা বালিশের নীচে ছিল । হরিণী বেগম গুণে
> দেখে দু’হাজার টাকা কম । মেজাজ গরমের কারন এই । বছর শেষে কিসের দু’চার হাজার
> টাকা বেশী থাকার কথা ,সেখানে আরো কম। চোখ কচলাতে কচলাতে ডাইনিং স্পেসে এসে
> দেখে বৌ তার ছোট ছেলের টিফিন বক্স মুচছে । স্বামীর মুখ দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে
> হরিণী বেগম । “ বলি, বছর শেষে সবার বেতন বাড়ে তোমার কম কেন ” ? কোম্পানী লাভ
> করেনি এজন্য দু’হাজার টাকা কমিয়েছে । বাকী বাক্য শেষ হবার পূর্বেই উ করে ওঠে
> আবেদ আলী । বৌয়ের ছোরা টিফিন বক্সটা ডান কপালে লাগে । চোখটা বেচে যায় কোন
> রকম ।
>
>
>
> এসব কথা কখনোই কলিগদের বলা যাবে না । নিজের ফুটো প্রকাশ করতে নেই ,সেটা যত
> ছোটই হোক ।
>
>
>
> সাড়ে পাচঁটায় অফিস হতে বের হয় আবেদ আলী । বড় দিন । সূর্যটা ঠিকরে পরছে ঠিক
> কপাল বরাবর । কেটে যাওয়া স্থানটা টনটন করছে । বাসার পরিবেশের কথা চিন্তা করে
> মনটা বিষিয়ে ওঠে । ফলে বাসার পরিবর্তে পার্কের দিকে হাটা দেয় ।
>
>
>
> কোন বেঞ্চ ফাকা  নেই । জোয়ান,বুড়ো,অকালপক্ক সব বয়েসি জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে ।
> জোড়ায় যেন মহাশক্তি । অনেক খুজে একটি বেঞ্চ পায় । সামনে আবর্জনার স্তুপ । এজন্যেই
> ফাকা,ভেবে মনে মনে এক দমক হেসে নেয় আবেদ আলী । বেঞ্চে বসে সস্থিবোধ করে সে ।
> কাকের কর্কশ কন্ঠ ছাড়া কোন কিছুর শব্দ নেই । ওদের ঝগড়াঝাটি,খুনসুটি দেখতে দেখতে
> চোখ দুটি বুজে আসে তার । বোজা চোখে ভেসে আসে দুটি স্বপ্ন,একটি তার বৌয়ের
> সাথে ফ্লাটের দোতলায় বসবাসকারী সোবাহান সাহেবের পরকীয়ার রগরগে দৃশ্য অন্যটিতে
> সে এখন কোম্পানীর জিএম ।
>
> বৌ তার পরকীয়া করুক,সে এখন জিএম হওয়ার দিকেই এগোয় । দ্যাখে- সবাই তাকে সেলাম
> ঠুকছে । বেতন তার পঞ্চাশ হাজার । স্যুট-টাই পরে বসে আছে আরামদায়ক কেদারায় ।
> এসির মধ্যে থেকেও কৃত্রিমভাবে গা ঘামায় । ঠান্ডা পানির জন্য কলিং বেল টেপে । জুসের
> গ্লাস নিয়ে ঢোকে অফিসের সুন্দরী আয়া । ঠোটে টকটকে লিপস্টিক । হঠাৎ হোচট খেয়ে
> হাত হতে গ্লাসটা আবেদ আলীর টেবিলে পরে । জুস ছিটকে পরে তার কাটা স্থানে । একি
> জুস গরম কেন ? গরম লাগায় চমকে ওঠে । চোখ খুলে দেখে তার মাথার উপড় গাছের ডালে
> দুটি কাক বসে আছে । ঘেন্নায় রি রি করে ওঠে তার শরীর । স্যান্ডেল পরতে গিয়ে দেখে
> একপাটি নেই । যেটা পায়ে গলানো ছিল সেটা আছে অন্যটি হাওয়া । রাগ না করে হাসে
> আবেদ আলী ।
>
> দুই মাস আগে ফুটপাথ থেকে কিনেছিলো বাটা স্যান্ডেল জোড়া । বাসায় এসে দেখে ওটা
> বাটা নয় রাটা । এনিয়ে তুলকালাম কান্ড বাধিয়েছিল হরিণী বেগম । না থাক, এই মুহূর্তে
> হরিণী বেগমের কথা মনে করতে চায় না সে। উদোম পায়ে ফুটপাথ ধরে হাটে আবেদ আলী
> । উদ্দেশ্যহীনভাবে । তার কাছে মনে হয়, এটা স্বর্গীয় পথ-দু’পাশে বেহেশতী হুরেরা হাত
> বাড়িয়ে ডাকছে । কিন্তু সে জানে এটা ঈশ্বরের টোপ । লোভ দেখাচ্ছে । মধ্যবিত্তদের সবাই
> লোভ দেখায় । ফলাফল শুন্য । স্বর্গে তার লোভ নেই । তাই সে আবার যাপিত জীবনের পথে
> ধাবিত হয় ।
>
>
>
>
>
> হরংযধফংবষর৯@মসধরষ.পড়স
>
> ০১৭৬৮  ৭৯৪১৯১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন