ছোটগল্প:"বগা" -স্বপ্ননীল
ক্রমিক
অনুযায়ী নিচের দিকে যেসব ছাত্ররা থাকে তারমধ্যে বগা একজন।পড়াশুনা তো
মনদিয়ে করেই না উপরন্তু যত নষ্টের গোড়া বগা।কার চুল টানতে হবে, কার বই
লুকোতে হবে,কার বই কালিদিয়ে জ্যাবড়াতে হবে,... সবের মূলে বগা।এহেন বগার
স্কুল ইনস্পেকশনে এসেছেন ইনস্পেকটর।আগের দিন পই পই করে বুঝিয়েছে
স্কুলের সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত সবাই।কিন্তু বগার কানে
সে সব কথা ঢুকেছে কিনা একমাত্র বগাই জানে। সময়ে যে স্কুলে আসতে হবে বগা
সেসব তোয়াক্কা করে না। প্রায়দিনই লেট করে। স্কুলটাকে যেন সে নিজের
বানিয়ে নিয়েছে।তবে ইন্সপেকশনের দিন সময় মত বগা স্কুলে হাজির।ওর
পোশাক-আশাকও তেমন আহামরি নয়।যদিও স্কুল ড্রেস।তাতেও বগা একটু
অপরিস্কার।শিক্ষকরা অনেকবার ধরেছে মেরেছে, কিন্তু কোন কাজ হয়নি।
সেদিন
যথারীতি সবার মতো বগাও ক্লাসে বসেছে।পিছনের থেকে একবেঞ্চ আগে।ইন্সপেক্টর
ক্লাসে আসতেই ওরা সবাই উঠে দাঁড়াল।কিন্তু বগা বসে।পাশে বসা বন্ধুটি ওকে
খোঁচা দিচ্ছিল দাঁড়ানোর জন্যে।উল্টে বগা ওর প্যান্ট ধরে টান
মারল।বলল-ওই,বোস!
অবশ্য ইন্সপেক্টরের নজরে আসেনি ব্যাপারটা।
সবাই যে যার সিট নিল।সবার ভয় বগাকে নিয়েই।ওদিকে জানলার বাইরে অপেক্ষারত বিজ্ঞানের স্যার।বাইরে থেকে নজর রাখছে বগাকে।
ক্লাসে
এসে প্রথমে সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন ইন্সপেক্টর।সবাই হাসি-খুশি।
সেই খুশীতে বগাও কিছুটা সুর মেলাতে চাইছিল। কিন্তু পাশে বসে থাকা বন্ধুটি
এক্ষেত্রে ওকে নিয়ন্ত্রন করল।
এবার ইন্সপেক্টর জল নিয়ে একটু ভূমিকা টানার পর প্রশ্ন করলেন-বলতো, জলের অপর নাম জীবন কেন?
প্রশ্ন শুনে ছাত্র-ছাত্রীরা হাত তুলল।বগাও তুলেছে।বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক ফিসফিসিয়ে বললেন-বগা, ঠিক জানিস তো?
বগা বাইরের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানাল।কে
জানে? নিজে নিজেই শান্ত্বনা নিল বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক। ওদিকে বগা যেন
হাতটা আরো খানিকটা উঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করল।ওর গলার শিরাগুলো খেঁচে স্পষ্ট
দেখা যাচ্ছিল। বলার জন্য মরিয়া প্রয়াস।উত্তরটা যেন ওকেই বলতে বলা হয়
এরকম একটা ভাব।।কিন্তু সামনের দিকে বসা এক ছাত্র প্রশ্নটার উত্তর দিল।না
বলতে দেওয়ার জন্য বগার খুব আফসোস।যাঃ! মনেমনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।এমন
ভাব যেন বগা জানতই।
আবার পরের প্রশ্ন-জলের উৎস কি?
সকলের
সঙ্গে এবারও বগা হাত তুলেছে।কে জানে, ওর মনে কি চলছে।-বলার জন্য বগা যেন
অর্ধেকটা দাঁড়িয়ে উঠল।তবু ইন্সপেক্টরের চোখ ওকে এড়িয়ে এবারও অন্য
একজনকে জিজ্ঞেস করলেন।বগার মনে তীব্র অস্বস্তি। একটা চটাস্ শব্দে নিজের
হাতের চেটো দিয়ে বেঞ্চটাতে আঘাত করল। ওদিকে বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক ওর এই
আচরণে কটমট করে তাকাল।যাতে বগা একটু ভয় খায়।
যে
বগাকে সারাবছর আদর করে ,মেরে ধরে বোঝাতে পারেনি,সে যে এমন চোখকে ভয় করবে এ
আশা বৃথা।বরং মুখটাকে নম্র করে একটু হেসে ফিসফিসিয়ে ঈশারা করলেন -সামনে
দ্যাখ।
আবার পরের প্রশ্ন-আমাদের জীবনে জলের গুরুত্ব কি?
এবার বগা লাফিয়ে উঠে অনেকখানি হাত উঁচিয়ে আগবাড়িয়ে বলল-আমি বলব স্যার।বলে ইন্সপেক্টরের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল।
বগার এহেন অভিপ্রায়ে সবাই স্তম্ভিত।ইন্সপেক্টর বগাকে বলার নির্দেশ দিলেন।
বগার
জামাটার সামনের দিকের তিনটে বোতাম নেই।শুধু উপরের বোতামটাই যা আছে।নিচের
দিকে একটা গিঁট মেরে রেখেছে।বগা জামাটা এদিক-ওদিক টান দিতে দিতে উঠে
দাঁড়াল।ছাত্র শিক্ষক সবাই বগার দিকে তাকিয়ে।কি করবে বগা?বগা যদি সত্যি
সত্যি না বলতে পারে?পইপই করে কাল ওকে বুঝিয়েছে। এমনকি একদিন ইস্কুল না
আসলেও অসুবিধা নেই। তা সত্ত্বেও আজ ইস্কুলে আসল।অথচ এমনিই কত কতদিন
ইস্কুলে আসে না।তবুও তো ঠিকই ছিল,ও যদি ওভাবে নিজেকে আগবাড়িয়ে না বলত
তাহলে হয়ত এবারেও অন্য কেউ...?
কি করবে বগা?বগা যদি সত্যিই বলতে না পারে। স্কুলের মান সম্মান... উঃ আর ভাবতে পারছিনা।
জানলার ওপাশ থেকে বিজ্ঞানের স্যার প্রথম থেকেই দাঁড়িয়ে।সমানে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন।বগাকে নির্দেশ করে বললেন-বগা,বল।-যা জানিস বল।
কথা
শুনে বগা একবার জানলার দিকে তাকাল।সেই ফাঁকে আরো একবার জামাটা ঠিক করে নিল
নিজের।ওর নিরুত্তর দেখে ইন্সপেক্টর আবার বললেন-কি হল?...বলো?
বগা
এবার শুরু করল। একেবারে পঞ্চম সুরে।...আমাদের জীবনে জলের গুরুত্ব
অনেক।যেমন, বাবা যখন কাজ করতে করতে জল তেষ্টা পায় তখন যদি জল না পায় খুব
কষ্ট।আবার মা যখন ভাত রাঁধে তখনও জলের দরকার হয়।সন্ধেবেলা হাত-মুখ ধুয়ে
পড়তে বসতে হয়।-তখনও জল লাগে।
উত্তর শুনে ওদিকে
বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষকের মাথায় হাত।যাঃ! সব শেষ করেদিল বগা।ওর উত্তর শুনে
ওর সহপাঠিরাও মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল।ইন্সপেক্টরও বগার উত্তর শুনে হাসি
চাপতে না পেরে বগার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন
কিছুক্ষণ।বগা এক এক করে বলছিল।এবার বগাও একটু থামা দিল।বাইরের থেকে দৃষ্টি
সরিয়ে ইন্সপেক্টর ওর দিকে তাকিয়ে বললেন-শেষ?
না স্যার, আর একটা আছে।
ওর কথা শুনে সবাই থ।মনে মনে ভাবছিল কখন শেষ করে বগা।...
বলল-আমার
পাশের ঘরের পুটু ঠাকুমার একটি মাত্র ছেলে।বাইরে থাকে।অনেক টাকা।পাকার
ঘর।মাসে মাসে মাইনে পাঠায়।আর পুটু ঠাকুমা সেই টাকায় এটা ওটা কিনে
খায়।যখন নিজে যেতে না পারে আমি মাঝে মাঝে কিনে নিয়ে আসি।অবশ্য তারজন্য
আমাকেও ভালবেসে কোনবার বিস্কুট, কোনবার পাঁউরুটি, কোনবার চকলেট দিত।আমিও
সেই লোভে যখন তখন গিয়ে বলতাম-তোমাকে যেতে হবে না।দাও কি আনতে হবে।আমি এনে
দেব।কোন কোনবার আনতে গিয়ে ইস্কুলে আসতে দেরি হয়েছে।তারজন্য একঠ্যাং
কোনদিন বা মার খেয়েছি।কিন্তু লোভ সামলাতে পারিনি।
কিন্তু
এসব কথার সঙ্গে জলের কি গুরুত্ব কেউ বুঝে উঠতে পারেনি।না ছাত্র,না বাইরে
অপেক্ষারত শিক্ষক,না ইন্সপেক্টর।তবু কি বলতে চাইছে বলুক।বাধা দিলনা
ইন্সপেক্টর।
বগা বলল-সেদিন পুটু ঠাকুমার খুব জ্বর।আমি
গিয়ে মাথা টিপে দিচ্ছিলাম।পা-টিপে দিচ্ছিলাম।তাতেও কমেনি।জ্বরে গা-হাত
পুড়ে যাচ্ছিল।লেপটাকে আচ্ছা করে জড়িয়ে দিলাম।গা'টা খুব কাঁপছিল।
পুটুঠাকুমা বালিশের নিচ থেকে একটা কাগজ আমার হাতে দিয়ে বলল,এই ঔষধটা আন।
আমি
শুনা মাত্রই এক দৌড়ে গেলাম দোকানে।প্রাণপনে ছুটে গেলাম।যেন বাতাসের মত
গতি পেয়েছিলাম তখন।নিমেষের মধ্যে পৌঁছেগেলাম দোকানে। কাগজটা দিতেই
ঔষধগুলো এক এক করে দিল।এরপর দোকানদার জিজ্ঞেস করল -কিরে, চকলেট না বিস্কুট?সেদিন আর চকলেট বা বিস্কুট কিছুই কিনতে ইচ্ছে করল না। হাঁপাতে হাঁপাতে ঔষধ নিয়ে ফিরে এসে দেখি পুটুঠাকুমার
মুখদিয়ে ফেনা বেরাচ্ছিল।আর জল জল বলে খুব আস্তে আস্তে বলছিল।আমি ছুটে
গিয়ে গেলাসে করে জল আনলাম।কিন্তু পুটুঠাকুমা ততক্ষণে আর নেই।
আমি যদি ঠিক সময়ে জল দিতাম তবে আজ ক্লাসের বন্ধু টুকাইয়ের কাছে একটা চকলেটের জন্য মারখেতে হত না।
কথাগুলো বলে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বেঞ্চিটাতে বসে পড়ল বগা।
ক্লাসঘরটা মুহূর্তের মধ্যে যেন থম হয়েগেল।কারো মুখে হাসি নেই।বাইরে
বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই তখনো নির্বাক দাঁড়িয়ে।ইন্সপেক্টর এগিয়ে এলেন ওর
কাছে।ওকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে।সঙ্গে সঙ্গে গোটা ক্লাস ঘরটা যেন খুব ভার
হয়ে গেল।
সমাপ্ত
গল্পকার-স্বপ্ননীল
ঠিকানা:
সিতিবিন্দা/সাহড়দা/পিংলা/পশ্চি ম মেদিনীপুর/৭২১১৩১/পশ্চিমবঙ্গ/ভা রতবর্ষ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন