শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

কুমারী হালিমা খাতুন (মুক্তা)















সম্পূর্ন উপন্যাস
কুমারী
কুমারী ও কুমারী
দুই তালা থেকে উত্তর এল জি খালু জান। তোকে তো এখন আর দেখাই যাই না, কোথাই থাকিস দুই তলাই? না  খালুজান বড় সাহেব ডেকে ছিল। কি করছে তোর বড় সাহেব। বারান্দায় বসে আছে। তোকে ডেকে ছিল কেন? এসময় এসে প্রশ্ন করল খালাম্মা। মানে আফতাব চৌধুরীর স্ত্রী  আমেনা চৌধুরী। কুমারীর খালুজানের নাম আফতাব চৌধুরী । খুব বংশীয় ঘরের ছেলে। আফতাব চৌধুরী তার চাচাতো বোন আমেনা চৌধুরীকে বিয়ে করেন। আফতাব চৌধুরীর দুই ছেলে । মেয়ে নেই। বড়টার নাম রিয়াদ পড়ে দশম শ্রেনিতে। ছোটটার নাম ফরহাদ পড়ে অষ্টম শ্রেনিতে। আর এই কুমারী পড়ে সপ্তম শ্রেনিতে কুমারী দেখতে এক কথায় অপরুপা। পড়াশুনাও খুব ভাল। আফতাব চৌধুরী কুমারীর নিজের খালুজান না। কুমারী এক মাষ্টারের মেয়ে। তার আর কোন ভাই বোন ছিল না । তারা তিনটি প্রাণি খুবই সুখেই ছিল। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম কেউ বেশি দিন সুখে থাকে না। তাই কুমারীর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন হঠাৎ এক দিন কুমারীর মা মারা যায়। মাষ্টার সাহের কুমারীকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। তার পরের বছর কুমারীদের গ্রামে বন্যা হয়। বন্যার পানি কুমারীদের  ঘর বাড়ি সব গ্রাস করে তখন মাষ্টার সাহেব তার মেয়েকে নিয়ে আরো চিন্তুায় পরে যায়। একদিন কুমারীকে এক পরিচিত বাড়িতে রেখে মাষ্টার সাহেব শহরে যায় কিছু জিনিসপত্র কিনতে। পথিমধ্য এক দ্রুতগামী ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়ে সাথে সাথে  মাষ্টার সাহেব সেখানেই মারা যায়। কুমারীর জন্য তিনি কিছু করে যেতে পারেনি। তখন কুমারীর দূর অবস্থা দেখে কুমারীর এক দূর সম্পার্কের চাচা কুমারীকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। কুমারীর এই চাচার চার ছেলেমেয়ে। আবার কুমারীকে নিয়ে আসায় তার চাচি সন্তুষ্ট হন না। সে অহেতুক উপদ্রব মেনে নিতে পারল না । তাই সে কুমারীকে দিয়ে সমস্ত সংসারের কাজ করায়। এভাবে কুমারীর তিন বছর চলে গেল। তার বয়স এখন ৯ বছর। সেই সময় কুমারীর চাচার বন্ধু অর্থাৎ আফতাব চৌধুরী বেড়াতে আছেন। অনেক দিন পর বন্ধুর সাথে দেখা তাই কুমারীর চাচা বন্ধুকে অনেক খাতির যতœ করলেন। দুই বন্ধুর মাঝখানে কুমারী নাস্তার ট্রে হাতে নিয়ে গুটি গুটি পাঁয়ে টেবিলে রেখে চলে গেল। আফতাব চৌধুরীর মেয়েটাকে খুবই ভাল লাগল। মনে হল মেয়েটা খুুবিই ভদ্র কিন্তু আবার দুঃখ পেল কারণ মেয়েটার গায়ে ময়লা ও ছেড়া পোশাক। আফতাব চৌধুরী জিজ্ঞাসা করল বন্ধু মেয়েটি কে? কী নাম। ও ওই মেয়েটির নাম কুমারী। তোদের বাড়ি থাকে বুঝি। হ্যাঁ। তা মেয়েটিকে কি পড়াস? না বন্ধু মেয়েটি যে সংসারের আলাদা একটি বোঝা। তার উপর আবার পড়া! ওকে যদি আমি পড়াই তাহলে তো আমার স্ত্রীর গঞ্জনার  জন্য ও আমাদের বাড়িতে থাকতে পারবে না। আফতাব চৌধুরী আশ্চার্য হয়ে বল্লো কেন কেন মেয়েটি তোদের সংসারের বোঝা কেন। তখন আফতাব চৌধুরীর বন্ধু সংক্ষেপে কুুমারীর ঘটনা খুলে বল্লো। সমস্ত ঘটনা শুনে আফতাব চৌধুরী খুব দুঃখ করল। আর বল্লো এমন একটি মেয়ে আমার প্রয়োজন। তুই যদি কিছু মনে না করিস আমি মেয়েটিকে নিয়ে যেতে চাই ওকে আমি পড়ালেখা শিখাব। আফতাব চৌধুরীর কথা শুনে তার বন্ধু অনায়াসে খুশি মনে কুমারীকে দিয়ে দিলেন। সেই থেকে কুমারী আফতাব চৌধুরী আর আফতাব চৌধুরীর স্ত্রীকে খালা আর খালু জান বলে ডাকে, আর আফতাব দুই ছেলেকে বড় সাহেব ও ছোট সাহেব বলে ডাকে। এই ডাকে কেউ অখুশি নয়। বরং সবাই খুশি রিয়াদ ও ফরাদ আরো খুশি সাহেব ডাকায় । কুমারীকে আনার সাথে সাথে তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। কুমারী ৭ম শ্রেনিতে উঠা পর্যন্ত কোন দিন প্রাইভেট পড়েনি। কুমারীকে রিয়াদ নিজেই পড়িয়েছে। এখনও পড়ায়। কুমারী বল্লো বড় সাহেবের জ্বর তাই আপনাকে বলতে বলেছে। আমেনা বেগম বল্লো কি! রিয়াদের জ্বর তা আগে বলিস নি কেন? আমেনা বেগম তাড়াতাড়ি ছেলের কাছে চলে গেলেন।
(২)
ইদানিং আমেনা বেগম কুমারীর প্রতি রেগে রয়েছে। কারণ সে বুঝেনিয়েছে যে রিয়াদের এস,এস,সির  জন্য বেশি পড়াশুনার পরও কুমারীকে পড়াতে গিয়ে তার ছেলে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। তিনি ঠিক করলেন কুমারীকে অন্য কোথাও পড়াবেন। আমেনা বেগম রিয়াদের ঘরে গেল। রিয়াদের কপালে হাত দিয়ে দেখল এখনো বেশ জ্বর আছে। মায়ের হাতের ছোয়ায় রিয়াদ বিছানার  উপর উঠে বসল। আমেনা বেগম জিজ্ঞাসা করল তোর একটু জ্বর কমছে? কখন থেকে জ্বর আসল ? তোর সাথে আমার একটু কথা ছিল। কি কথা আম্মা! কুমারীর পড়ার বেপারে। কুমারীর পড়ার আবার কি হলো। না কিছু হয়নি, তবে আমি মনে করছি তোর সামনে পরীক্ষা তাই আমি কুমারীকে অন্য কোথাও পড়াতে চাই। একথা শুনে রিয়াদের মুখ মলিন হয়ে গেল। তোর সুবিধার জন্য বাবা! রিয়াদ তখনই বল্লো না-না আম্মা আমার পড়া পড়েও আমি কুমারীকে পড়াতে পারি। ও জন্য আমার কোন অসুবিধা হবে না। আর আমার তো সিলেবাস কমপ্লিট ।এখন  শুধু রিভাইজ দিব। আমেনা বেগমের মুখ কালো হয়ে গেল। কুমারীর ব্যাপারে তার ছেলের বাড়াবাড়ি তার পছন্দ হল না। তবুও আর কিছু না বলে তিনি নিরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রিয়াদ পড়ার টেবিলে বসে বইতে চোখ বুলাচ্ছে তখন ৩ টা বাজে। কুমারী তার রুমে ঢুকে চেচিয়ে উঠল । এখন ভরদুপুরে সাহেবের পড়া হচ্ছে! পড়া আর সময় নেই!  এখন একটু ঘুমালেও পারতেন রিয়াদ মিনমিনে কণ্ঠে বলল, জানিস তো সামনে তো আমার পরীক্ষা এখন আমার বেশি পড়তে হবে। তাই বলে কোন সময় অসময় নেই! পড়তে হবে! ওতো পড়ে খাবে কেডা। কেন তুই খাবি! কুমারী চোখ বড় করে রিয়াদের দিকে তাকাল রিয়াদ একটু ঠাট্টা করে বলল ওরে বাপরে ! আজকে যে পরী মাটিতে থাকবে না,  উপরে উঠে যাবে। কেন কেন উপরে উঠব কেন! কুমারীর সাথে একটু মস্কারা করলেই কুমারী কান্দার মত হয়ে যায়। এখনো কান্নার মত হয়ে সে নিচে নেমে গেল।
শুনছো রিয়াদের বাবা তোমার গুনধর ছেলের কথা! কেন কি হয়েছে রিয়াদের? আমি বললাম বাবা সামনে তোমার পরীক্ষা  কুমারীকে আর পড়িও না। আমি ওকে অন্য যায়গায় পড়াবো। নইলে তোমার ডিষ্টার্ব হবে, কিন্তু সে এ কথা শুনতে চায় না  আফতাব চৌধরী হেসে বলল ও এই আমার গুনধর ছেলের কথা! আরো বলে ওর সব পড়া কমপ্লিট। কুমারীর জন্য ওর কোন ডিষ্টার্ব হবে না। ওর যদি ডিষ্টার্ব না হয়ে তাহলে পড়াক না মেয়েটাকে অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা কোথায়! দেখবো ছেলের রেজাল্ট কেমন হয়। তারপর তোমার সাথে বোঝাপড়া হবে আমার। কপাট রেগে আমেনা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আফতাব চৌধুরী স্ত্রীর গমন পথের দিকে চেয়ে রইন।
(৩)
কিরে কুমারী তুই এখানে কি চাস? ছোট সাহেব খালা আম্মা আপনাকে ডাকছেন। কি জন্য? তা আমি জানিনা। তুই যা আমি আসছি। আমেনা বেগম রান্না ঘরে ছিল। ফরহাদ এসে জিজ্ঞাসা করল আম্মা আপনি আমাকে ডাকছেন? হ্যাঁ ডেকেছি। তোর কি এখন বিশেষ কাজ আছে? না নেই। তাহলে তোর খালা আম্মাদের বাড়িকে একটু যা তো। গিয়ে বলিস কালকে যেন আমাদের বাড়িতে চলে আসে। জোর দিয়ে বলবি কিন্তু। ঠিক আছে আম্মা আমি যাচ্ছি। এখনি যা নইলে আবার সন্ধা হয়ে যাবে। *পরের দিন দুই বোন পাশাপাশি বসে আছে। সলাপড়া করছে। আমেনা বেগম বলল তুই কিন্তু কুমারীর ব্যাপারে ভাবছিস নিলু? নিলু  আমেনা বেগমের ছোট বোন। কিন্তু ছোট হলে কি হবে বুদ্ধির ঢেকি। আমেনা বেগমের বাড়ি কিছু হলেই তার এই ছোট বোনকে ডেকে এনে পরামর্শে বসে। তার এই স্বভাবের জন্য আফতাব চৌধুরী একটু দুঃখ পান। কিন্তু তিনি কিছু বলেন না। আমি ইদানিং একটা জিনিস দেখছি সে হল কুমারীর প্রতি রিয়াদের একটু বাড়তি আকার্ষণ। এখন আমি তোকে ডেকে এনেছি এর উপায় আমাকে বল যাতে বাড়তি আকার্ষন কেটে যায়। উপায় একটা আছে বুবু। সেটা হলো রিয়াদের পরীক্ষা শেষ হলে তুই ওকে ভাইয়ার বাসায় পাঠায়া দে। ভাইয়ার ছেলে নেই, ভালই হবে। কি বলিস? ওখানে থেকে পড়াশুনা করবে। নিলুর কথা ই আমেনা বেগম খুশি হয়ে হেসে উঠল। তুই ভাল একটা উপায় বের করেছিস নিলু। জানিস আমি খুব টেনশনে ছিলাম। এখন একটু কুমলো। *কি রে কুমারী তুই হঠাৎ এই ঘরে! তোকে আমি আজ তিন দিন দেখিনি তুই কি আমার উপরে রাগ করিছিস। না বড় সাহেব রাগ করেনি । রাগ করবো কেন? তাহলে আসিস নি কেন? আমার পরীক্ষা তিনটি হয়ে গেল তুই খোজ খবর নিলি না। পরীক্ষা আমার কেমন চলছে। প্রথম দিন তোকে বলতে গেছি। বাবা, কুমারী বিবি একেবারে হাওয়া হয়ে গেছে। কুমারী বিষন্ন কণ্ঠে বলল। আপনার পড়ায় যদি কোন অসুবিধা হয় এই জন্য আমি আসিনি। রিয়াদ একটু রশিকতা করে বল, বাবাঃ এত মানুষ এল আর গেল, আর কুমারী বিবি বলে নাকি তিনি আসলে নাকি আমার পড়ায় অসুবিধা হবে। কি জন্য আসিনি তা কি আপনি জানেন? কি জন্য? খালা আম্মা আমাকে নিষেধ করেছে। বলেছেন তোর বড় সাহেবের পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুই ওঘরে যাবি না। তাহলে এখন আসছিস কেন? কুমারী চুপ করে রইল। ও -বুঝিছি তোর বড় সাহেবকে না দেখে আর বুঝি থাকতে পারিস না। না থাকতে পারবো কেন? এই তিন দিন কেমন করে ছিলাম। আপনার ঘরে আর আসবো না। কুমারী দ্রুত পায়ে ঘর থেকে চলে গেল। কুমারী ...........কুমারী ........শোন। কুমারী যে তার ডাক শুনবে না এটা রিয়াদ জানে তাই আর না ডেকে পড়ায় মন বসালো।
(৪)
ইতি মধ্যে রিয়াদের রেজাল্ট বের হল। রিয়াদ ফাষ্ট ডিবিশনে একটা লেটার সহ পাশ করল। আমেনা বেগম আফতাব চৌধুরীর সাথে আলাপ করে রিয়াদকে তার মামা বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। রিয়াদ প্রথম তার মামা বাড়ি যেতে চাইল না । কিন্তু তার আম্মার অনুরোধে বাধ্য হলো শেষ পর্যন্ত যেতে।রিয়াদ জানে কুমারীর থেকে সরিয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতি। মা দোয়া করেছেন । রিয়াদ ভাবল যাওয়ার আগেই কুমারীকে বলতে হবে। নাইলে সে না থাকায় এই ফাকে যদি তার আম্মা কুমারীকে বিয়ে দিয়ে দেয় । না না রিয়াদ আর ভাবতে পারে না! রিয়াদের যাওয়ার কথা শুনে কুমারীর মন খারাপ। সে মন খারাপ করে সেই সকাল থেকে রিয়াদের সাথে দেখা করেনি। সে ঘরে চুপচাপ বসে আছে। এদিক থেকে রিয়াদ কুমারীকে কয়েকটি কথা বলার জন্য তার ঘরে এল কুমারীর ঘরের দরজাই রিয়াদকে দেখে ধরমড় করে শুয়া থেকে উঠে বসল। বড় সাহেব আপনি আমার ঘরে? কেন কি মানা আছে নাকি? না  মানা থাকবে কেন? তোমার কী শরীল খারাপ কুমারী। না। তাহলে এ অসময় বিছানায় কেন? এই মধ্যে নিশ্চয় একটা কারণ আছে। নইলে কেউ এই অসময় শুয়ে থাকে নাকি? আমি চলে যাচ্ছি তা কি তুমি জান? জানি। তোমার পড়ার প্রতি খেয়াল রাখবে বুঝলে। আমি যেতাম না আম্মার পিড়াপিড়িতে যেতে হচ্ছে। কেন আপনি যেতেন না? কেন আবার তোমার জন্য! কুমারী আশ্চার্য হয়ে বলল আমার জন্য! আমি আপনার কে? আমার জন্য কেন যেতে চাচ্ছেন না। রিয়াদ ব্যাকুল কণ্ঠে বলল কেন তুমি যে আমার সব। তোমাকে নিয়ে আমি কত স্বপ্ন দেখি। আর তুমি বলছো আমার কে? কুমারী বিস্ময় নিয়ে বলল একি বলছেন বড় সাহেব। হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ঠিক বলছি। তুমি কি কিছুই বুঝনা কুমারী। আমি ঠিকই বুঝি কিন্তু আমার অত সাহস হয় না। কারণ আমাকে অনুগ্রহ করে আমারকে মানুষ করেছেন এর চেয়ে আর বেশি কি চেতে পারি। না না না ও কথা তুমি বলোনা।  তুমি কথা দাও আমাকে ছেড়ে তুমি অন্য কোথাও যাবে না। বল বল ! ঠিক আছে আমি আপনা জন্য আপেক্ষা করব। অনন্ত কাল এই আপেক্ষা করা যদি আমার মরণ ও ডেকে নিয়ে আসে তাতেও আমার কোন দুঃখ হবে না।
(৫)
এদিকে রিয়াদ চলে যাওয়াতে কুমারীর মন ভাল না। পড়ার মন বসে না। কোন কাজেও মন বসে না। ওদিকে রিয়াদেরও সেই অবস্থা। কুমারীর কথা চিন্তা করতে করতে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। তাই মামা প্রায় বলে ধীরে ধীরে তোর শরীর ভেঙ্গে পড়ছে কেন? শরীরের দিকে একটু যতœ নিবে। রিয়াদ চলে গেছে প্রায় এক বছর হল। এর মধ্যে রিয়াদ অনেক চিঠি পেয়েছে। কুমারীও কয়েকটি চিঠি দিয়েছে কিন্তু খুব সাবধানে। আমেনা বেগম ইতি মধ্যে কুমারীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আফতাব চৌধুরীর জন্য  পেরে উঠছেন না। তিনি বলছেন ছোট মেয়ে ও কেবল ৯ম শ্রেনিতে পড়ছে। এখন ওর বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। সেদিন বিকাল বেলা কুমারী সমনের বারান্দায় বসে আছে। তখন দেখে একটা লোক এদিকে আসছে। লোকটি কাছে এসে বলল তোমার নাম কি কুমারী? জ্বি আপনিকে? আমার সাথে রিয়াদের পরিচয় আছে আমি ওখান থেকে আসলাম। তোমার একটা চিঠি দিয়েছে রিয়াদ। কুমারী হাত বারিয়ে চিঠিটি নিল । আপনি বসুন একটু নাস্তা করে যান। না ঠিক আছে। আরেক দিন করব। আজ আমি আসি কুমারী চিঠিটা এনে সাবধানে পড়তে লাগল। প্রিয় কুমারী সর্ব প্রথম রইল তোমার জন্য আমার এক গুচ্ছ লাল গোলাপের শুভেচ্ছা। আমি এক প্রকার ভালই আছি। আশা করি তুমিও ভাল আছ । আমি খুবই চিন্তায় আছি কারণ অনেক দিন যাবত তোমার কোন পত্র পাইনা। তুমি কি আমায় ভুলে যাচ্ছ? আসলেই নিত্তান্তই এ তুচ্ছ মানুষটা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে। জানিনা এ শেষ কোথায় । যাহোক, আমার পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা ভালই হচ্ছে। পরীক্ষার পর আমি বাড়ি চলে আসব। কারণ তুমি ছাড়া আমার ভাল লাগে না তোমার শরীরের প্রতি যতœ নিবে। আর বাড়ি কথা জানিয়ে চিঠি দিবে। আর বিশেষ কিছু লেখলাম না।  “ইতি” “তোমার হতভাগা রিয়াদ”। চিঠি পড়ে কুমারী ভাল লাগতে লাগল। কারণ রিয়াদ পরীক্ষার পরে বাড়ি চলে আসবে। কিন্তু তার এই ভাল লাগা দীর্ঘক্ষন স্থায়ী হল না। কারণ পরের দিন সকাল বেলা বাড়ির কাজের মেয়েটা কুমারীর ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে চিঠিটা বিছানার উপর পেল। কুমারী চিঠিটা বেখেয়ালে বিছানার উপর রেখে দিয়েছে। কাজের মেয়েটা বুঝতে পেরে চিঠিটা সোজা গিয়ে আামেনা বেগমের হতে দিল। আমেনা বেগম চিঠিটা পড়ে মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। চিঠির কথা শুনতে পেয়ে ফরহাদ কুমারীকে একটা থাপ্পড় মেরে বলল, ছোট লোক কোথাকার আমার ভাইয়ার সাথে প্রেম করতে তোর লজ্জা করে না । তোর ভাবা উচিত এই দুনিয়াই তোর কেউ নেই। আমাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিস। এই কথা শুনে কুমারী ঝর ঝর করে কেঁদে দিল। ওমনি আমেনা বেগম গর্জে উঠলেন, বুড়ি মেয়ের আবার কান্না হচ্ছে। এভাবে সবার মন গলাতে চায়। কি কষ্ট করে ওকে এই কয়টা বছর মানুষ করেছি। তোকে আমি মেয়ের মত জেনেছি। আর তুই আমার কপাল খালি।অভদ্র মেয়ে! সেই সময় আফতাব চৌধুরী কথা বলে উঠল। আহা মেয়েটিকে আর বকো না। অল্প বয়সের মেয়ে আবেগে  না হয় একটা ভুলই করে বসেছে। তার জন্য এত বকা বকি কেন! এমনি বুঝাই দিলে তো হয়। তুমি চুপ কর, তোমার আসকারায় মেয়েটি আজ এত দূর, এখন তুমি সামলাও। সেই রাতে কুমারী আর ভাত খেল না। আফতাব চৌধুরী কত সাধলেন তবুও কুমারী ভাত খেলেন না সারা রাত কুমারী এপাশ ওপাশ করতে লাগল। দুই চোখের জল ফেলতে ফেলতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। তার পরের দিন সকাল থেকে কুমারীকে চোখে চোখে রাখা হল সে যেন চিঠি লেখতে না পারে আমেনা বেগম কুমারীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পরে লেগেছেন। কারণ রিয়াদ আসার আগে কুমারীকে বিয়ে দিতে চান।
(৬)
কুমারীকে দেখে পাত্রপক্ষের খুবই পছন্দ হয়েছে। বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে। আর মোটে দুই দিন বাকি। আফতাব চৌধুরী এ বিয়েতে রাজি নন। কারণ মনে মনে কুমারীকে তার পছন্দ। ছেলের সাথে বিয়ে হলে হোক ভালই মানাবে। কিন্তু তার স্ত্রীর এক রোখার মনোভাবের জন্য তিনি এ বিয়েতে বাধা দেননি। কিন্তু এপাশতে ওপাশতে অনেক কথা বুঝিয়েছেন, কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
বিয়ের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, কুমারীর শরীর ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ বিয়ে থেকে কি ভাবে রেহাই পাওয়া যায়। কুমারী ভেবে পাচ্ছে না। কারণ চিঠি লেখার কোন উপায় নেই। আবার পালানোরও কোন পথ নেই। এখন কি করা যায়। অনেক ভেবে চিন্তে কুমারী ঠিক করল দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিবে।
*কিরে মনা ত্ইু এখানে কি চাস? মনা আমেনা বেগমদের বাড়ির চাকরানী। খুবই বিশ্বাস্ত। মনা মুখ মলিন করে বলল খালাম্মা কুমারীকে পাওয়া যাচ্ছে না। কি বল্লি ! কখন থেকে। প্রায় আধা ঘন্টা। আমি উপরে যখন কাজ করছিলাম তখনও তার রুমে দেখে গেয়েছি। ফিরে এসে দিখি নাই। তা- আমাকে আগে বলিস নি কেন! আমি মনে করেছি যে বাথরুমে গেছে। কিন্তু অনেকক্ষন পরেও বের হতে না দেখে আমার সন্দেহ হয়।  আমি খোঁজা খোঁজি করি। কিন্তু কোথাও পায়নি। শুধু একটা চিঠি পেয়েছি তার বিছানায়। কই দে তো  মনা আমেনা বেগমের হাতে চিঠিটা দিল । তিনি চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। “প্রিয় খালাম্মা জান”, পত্রে আমার সালাম নিবেন। পর সংবাদ, আমার জন্য আপনাদের কোন ক্ষতি হোক তা আমি চাই না। তাই আমি পরের মেয়ে আপনাদের থেকে পর হয়ে গেলাম । আমার জন্য আপনাদের আর কোন অসুবিধা হবে না। ইতি হতভাগা কুমারী ।
কুমারীর নিখোঁজ হওয়া সংবাদ শুনে আফতাব চৌধুরী মাথায় যেন বাচ পড়ল। তিনি সব আত্মিয় স্বজনদের বাড়ি খোঁজ করলেন। কুমারীর চাচার বাড়িও খোঁজ করলেন। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। এদিকে বিয়ের দিন পাকাপোক্ত হয়ে আছে। মানসম্মানের ব্যাপার । এদিকে আমেনা বেগম আবিরাম কান্না কাটিতে ব্যস্ত  আছে। এখন তার সব রাগ গিয়ে পড়েছে তার বোন নিলুর উপর। তার জন্যই তো কুমারীর এত তড়ীঘড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করা হল। এত তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা না করলে তো আর সে পালাতো না। মানসম্মান ও যেত না। তার স্বামীরও অসুখটা বাড়ত না । আফতাব চৌধুরীর পুরানো অসুখটা বেড়ে গেছে। তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছে।
(৭)
খবর শুনে রিয়াদ বাড়ি ফিরল। সব ঘটনা শুনে সে খুবই ভেঙ্গে পড়ল। বাবাকে দেখে রিয়াদ আর সয্য করতে পারলো না। কেঁদে দিল। কুমারীর জন্য ও মন খারাপ, কোথায় গেল মেয়েটা । এই বয়সের মেয়ে ওর তো কোন আত্মিয় স্বজন নেই । রিয়াদ আর ভাবতে পারে না। রিয়াদ হসপিটাল থেকে বাড়িতে এসে কুমারীর শেষ চিঠিটা পড়তে লাগল। দুই চোখের আশ্রু সে আর ধরে রাখতে পারেনি। রিয়াদ এসে আবার সব জায়গায় খোঁজ করেছে। কিন্তু কোথাও পায়নি।
*তার দুই দিন পর আফতাব চৌধুরী হসপিটাল থেকে বাড়ি আসল । আমেনা বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছে। আফতাব চৌধুরী বসে আছে। তার দুই চোখ বুজা। দেখে মনে হবে সে গভীর চিন্তায় মগ্ন। এমন সময় আমেনা বেগম ঘরের ভিতর এসে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল। তার মুখ অশ্রুতে ভরা। স্ত্রীর আসার  শব্দে তার দিকে তাকালেন। কি হয়েছে তোমার মুখ মলিন কেন? তোমার তো মুখ মলিন হওয়ার কথা না? তোমার তো পথ পরিস্কার হয়ে গেছে। আমেনা বেগম ডুকরে কেঁদে বলেলন আরো বল আমার পেরাচিত্ত আমাকে করতেই হবে। রিয়াদ আমার সাথে কথাই বলছে না। বাড়ি খাওয়া দাওয়া করছে না। ছেলেটার চেহারার কি হালটা হয়েছে । এসবই তো  আমার জন্য। দেখ তুমি যে কাজ করছ তাতে ছেলেটা খুব দুঃখ পেয়েছে। এজন্যই কথা বলছে না । ও ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কিছু চিন্তা করো না। আমেনা বেগম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
(৮)
আফতাব চৌধুরী বিকালে বারান্দায় বসে একটা পেপার নাড়াচাড়া করছিলেন। এমন সময় কাজের মেয়ে এসে বলল, খালুজান একটা লোক আসছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চায়। আমি ড্রয়িং রুমে বসতে দিয়েছি। আফতাব চৌধুরীকে রুমে ডুকতে দেখে লোকটা সালাম দিল। কি বাবা তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না। আমার নাম রায়হান। আমি আপনাকে একটি সংবাদ দিতে এসেছি। কি সংবাদ বাবা? কুমারী নামে আপনাদের কি কোন মেয়ে ছিল। হ্যাঁ -হ্যাঁ বাবা ছিল। ও এখন কোথায়? তুমি কি তার সংবাদ নিয়ে এসেছো? হ্যাঁ আমি ওকে পেয়েছি।
সেদিন রাতে প্রায় নয়টার সময় আমি বাড়ি ফিরছিলাম। তখন কি যেন একটা আমার গাড়ীর সামনে পড়ল। আমি তাড়াতাড়ি ব্রেক কসে নেমে দেখলাম একটি মেয়ে। মেয়েটি গাড়ীর সাথে ধাক্কা খাওয়াই কয়েক জায়গায় কেটে গেছে এবং অজ্ঞান হয়ে গেয়েছিল। তাড়াতাড়ি আমি গাড়ীতে উঠিয়ে আমার বাসায় নিয়ে গেলাম । আফতাব চৌধুরী যেন গোগ্রাসে লোকটার কথা শুনছিল। কখন যেন আমেনা বেগম ও পর্দার ওপাশে দাড়িয়ে শুনছিলেন। মেয়েটার কাছ থেকে সব কথা জানতে পেরে আমি আপনাদের বাড়ি আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটা বলল আপনি যাবেন না, কারণ সে বাড়ি থেকে আমি চলে আসছি। আর আমি ও বাড়ি যাব না। দরকার হলে আমি আপনার বাড়ি থেকে চলে যাব। তবুও আপনি ও বাড়ি খবর দিবেন  না । তবুও আমি আসতাম কিন্তু কাজের চাপের জন্য এই চার দিন আসতে পারিনি। আমি দুঃখিত আমার দেরির জন্য আমি এখন উঠি। না -না একটু চা নাস্তা করে যান ।
(৯)
আমেনা বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরে খুবই অনুতপ্ত হয়েছেন। তিনি নিজে গিয়ে কুমারীকে বাড়িতে এনেছেন। কুমারী এ বাড়ি আসতে একে  বারে অনিচ্ছুক ।  তবুও আফতাব চৌধুরীর অনুরোধে এবাড়িতে এসেছে আজ সন্ধায়। রিয়াদ এসবের কিছুই জানে না।  রিয়াদ কুমারীর হারিয়ে যাওয়া থেকে বাড়িতে অনেক রাত করে ফিরে। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এদিকে কুমারী রিয়াদের পথ পানে তাকিয়ে আছে। আফতাব চৌধুরী ও আমেনা বেগম ঠিক করেছেন রিয়াদ ও কুমারের বিয়ে দিবে। ঘড়িতে যখন রাত দশটা বাড়ির সবাই যার যার ঘরে। কুমারী অস্থির ভাবে তার ঘরে পায়চারি করছে। এমন সময় দোতলার সিড়িতে পায়ের শব্দ হল। কুমারী সচকিত হল। ধীরে ধীরে সিড়ি বেয়ে রিয়াদের ঘরের সামনে এল। পর্দার ফাঁকে উকি মেরে দেখল রিয়াদ খাটে শুয়ে আছে । চেহারাই মলিনতা ভাব। খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠে কেমন যেন রোগাটে হয়ে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কুমারী আর দেখতে না পেরে দরজার সামনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। শব্দ শুনে রিয়াদ ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। মনে এক রাশ প্রশ্ন এল। কুমারী এত রাতে কোথা থেকে এলো। কোথায় ছিল এতদিন। রিয়াদ কুমারীকে এনে বিছানায় শুয়ে দিল। তার পর পানি এনে চোখে মুখে ছিটাতে লাগল। কিছুক্ষন পর কুমারী আস্তে আস্তে চোখ খুলল। রিয়াদ এক সাথে অনেক প্রশ্ন করল। এতদিন কোথায় ছিলে তুমি! কি করে বা এলে, কুমারী তার সব ঘটনা খুলে বলে। সব ঘটনা শুনে রিয়াদ একটু সস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। কুমারী জিজ্ঞাসা করল তুমি ভাত খেয়েছো? খেয়েছি। কোথায়? হোটেলে। আচ্ছা আমি না থাকায় প্রতি দিন কি তুমি এত রাত করে বাড়ি ফিরো। থাক ও সব কথা এখন। কেন থাকবে? তুমি আমার জন্য তিলে তিলে তোমার জীবন নষ্ট করে দিতে পারো না। ঠিক আছে বাবা মাপ চাচ্ছি। আর এমনটি হবে না। যদি তুমি পাশে থাক। কুমারী ঠাট্টা করে বলল, ওরে বাবা এখন পাশে থাকতে পারবো না। কয়েক দিন পর। রিয়াদ সলজ্জো হেসে কুমারীর চিবুক ধরে বলল, সত্যিই তুমি আর কয়েক দিন পর আমার বধু হবে তো? তোমার বধু হব না তো আর কার বধু হব। খালাম্মা রাজি হয়েছেন যে। দুজনেই হেসে উঠল।
(সমাপ্ত)














ভালবাসার কষ্ট
হালিমা খাতুন (মুক্তা)

আমার হৃদয়ে একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে
সেখানে নিয়েমিত রক্ত ক্ষরন হয়।
অহনির্শ না পাওয়ার বেদনা
আমাকে জজরিত করে।

জানি বাস্তব মেনে নিতে হবে,
কিন্তু সে বড় কঠিন
আমার অন্তরে নিয়মিত ব্যাথার ¯্রােত বইছে
সেই ¯্রােতে ডুব দিতে হয় মাঝে মাঝে
ইচ্ছে-অনিচ্ছেই ।

আমার মনে একটা কষ্ট আছে
ভালবাসার কষ্ট।
সে কষ্টের বেদনা আমাকে নীল করে দেয়,
হাহাকার করে উঠে আমার ¯œায়ু
চৈত্রের দুপুরের রোদের মত খা খা করে আমার ভিতরটা,
যেখানে পুড়িয়ে দেয় আমার অন্তর।

আমার বুকের ভিতর একটি আগ্নিয়ও গিরি লাভা আছে
যেখান থেকে সারাক্ষণ ব্যাথার লাভা ছড়ায়
সে ব্যাথায় আমি পাগল প্রায়।
আমি সহ্য করতে পারিনা তার বিরহ, বিচ্ছেদ
তাই মাঝে মাঝে তাকে স্বরণ করে,
 চোখের জল ফেলাই। 

বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০১৭

ব্যর্থ অভিলাষ আলিশা। ।




















ব্যর্থ অভিলাষ
আলিশা। ।

অক্ষম, আধমরা শালিক
যন্ত্রণার বিষবাণে রক্তাক্ত পিঞ্জর নিয়ে
ছটফটিয়ে মরছে
একটু বাঁচবার আশায়।
আপন সত্তা আর কল্পনার প্রচ্ছদ,
হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে স্বপ্নের খড়কুটো।
একজীবনে আর কতো?
বিভৎস প্রেরণায় ভেসে
সুখের দিনগুলো আজ
স্মৃতির কারাগারে বন্দী।
ক্ষয় হচ্ছে শক্তির ক্যালসিয়াম
ঝরে পড়ছে আস্বাদনের স্বাদ,
অস্থিরতার পোকামাকড়ে ঠাসা
মনের অলিগলি।
একটু একটু করে এগিয়ে আসছে
শ্বাপদ সংকূল অমানিশা,
ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়ের আবর্তন
ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে নিঃশ্বাস!
কষ্টের নীলজল, বেদনার তাপদাহ
আড়াল করবার ব্যর্থ চেষ্টা,
পাছে ছানাদুটোর দীর্ঘশ্বাস
বাড়ে এই ভয়ে।

মায়াবী পাথর ==== আশেকা তৌহিদ সাথী





















মায়াবী পাথর
==== আশেকা তৌহিদ সাথী

জিসান ঢাকা শহরের এক নামকরা স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র। সে ২০১৭ সালের জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাসসহ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। তার অসাধারণ সাফল্যে বাবা-মা খুব খুশি। কিন্তু জিসান মানসিকভাবে সবসময় অস্থির থাকত। তার শুধু ভাবনা কবে এ সোনার বাংলা খাঁটি সোনায় পরিণত হবে। এদেশ হতে কবে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নিমর্ূূল হবে। কিভাবে মানুষের মধ্যে আবার ভালবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হবে। জিসান প্রকৃতির মধ্যে তার এ সমাধান খুঁজে বেড়ায়। একদিন এক পড়ন্ত বিকেলে জিসান কাউকে না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। সে জানে না কোথায় গেলে তার সমাধান খুঁজে পাবে। তারপরও সে তার গতিবেগ থামিয়ে দেয়নি। সে অবিরাম চলতে থাকে অজানার পথে। এভাবে একটানা চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও সে ক্লান্তিকে পরোয়া করেনি। শহরের পথ পেরিয়ে সে কখন যে গ্রামের পথে পা বাড়িয়েছে তা নিজেও জানে না। গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক বনের ভিতর সে ঢুকে পড়ে। সে খুব ভয় পায়, না জানি কখন কোন বিপদ এসে পড়ে। আল্লাহ ও রাসূলের উপর ভরসা করে সে চলতে থাকে। হঠাৎ বনের মধ্যে গাছের ফোকর বেয়ে জোসনার আলো দেখতে পেয়ে সে বুঝতে পারে তখন অনেক রাত আলোর ছোঁয়ায় জিসান স্বস্তি ফিরে পায়। একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে জিসান মাটিতে এক চিরকুট দেখতে পায়। চিরকুট পড়ে দেরি না করে সামনে এগিয়ে গেল। তীরচিহ্ন দেখে সে বামে গেল। তখন সেখানে এক বটগাছের নিচে দেখতে পেল এক আশ্বর্য পাথর। পাথর থেকে নানা রঙের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পাথরের সাথে পড়ে থাকা আরেকটি চিরকুটে লেখা ছিল এই পাথরের ছোঁয়ায় পৃথিবীর সকল অন্যায় তুমি দূর করতে পারবে। জিসান দেরি না করে পাথরটি নিয়ে ঢাকায় ফিলে এল। তারপর প্রথমে দেশ ও পরে পৃথিবী থেকে সকল অন্যায় সে দূর করলো। সকল মানুষের ভালবাসায় আজ সে মুগ্ধ। তার সোনার দেশ সত্যিকারের সোনায় পরিণত হল। এরপর মায়ের ডাকে জিসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। পরক্ষণেই বুঝতে পেরেছে জিসান এতক্ষণ স্বপ্নে ছিল। কিন্তু জিসান সেই পাথরের কথা ভুলেনি। সে পাথরটির নাম দেয় মায়াবী পাথর। যার মায়ার টানে জিসান আজো সেই পাথর খুঁজে বেড়ায় সকল অন্যায় দূর করতে।

বুধবার, ২৪ মে, ২০১৭

যাপিত জীবন > > নিশাদ আনোয়ার




















 যাপিত জীবন
>
> নিশাদ আনোয়ার
>
>
>
>
>
>           কেনই বা সত্য কথা বলতে গেল আর কেনই বা টিফিন বক্সের ঢিল খেয়ে কপাল
> কেটে নিল । বসে বসে নিরস বদনে ভাবছে আর কাজ করছে আবেদ আলী । অফিসে সে কখনো
> মন খারাপ করে থাকে না । বিষয়টি খেয়াল করে পাশে বসে থাকা আলাবক্স । পান খাওয়া
> দাতে তার আয়রণ পরেছে কয়েক পরত । হাসলে মনে হয় একটি দাতও নেই । সে আবার হাসি
> ছাড়া কথা বলতে পারে না । বেশ কয়েকবার ডাকে আবেদ আলী কে । সে শুনতে পায় না ।
> পানের রস আর মুখের লালা মিশে কেমন একটা জেলি তৈরী হয় মুখের ভেতর,আলাবক্স সেটা
> গিলে নিয়ে গলা পরিস্কার করে একটু জোড়ে ডাক দেয় -‘ও আবেদ ভাই মন খারাপ নাকি ?’
> না তো ভাই ।        ‘ আপনার কপালে কি হয়েছে ? অ্যা, ভাবী কি কপাল ফাটিয়ে
> দিয়েছেন ?’ রসিকতা করে আলাবক্স কিন্তু আবেদ আলীর মন ভালো হয় না বরং তার কথা
> শুনে কিছুটা আশ্চর্য হয় । তার বৌ যে কপাল ফাটিয়েছে এটা সে কিভাবে জানলো ?
> তাহলে কথাটা  বৌ-ই ফোন করে বলেছে । উত্তর না পাওয়ায় নিজের চেয়ার ছেড়ে আবেদ
> আলীর টেবিলের সামনে বসে আলাবক্স । গভীর ভাবে লক্ষ্য করে কেটে যাওয়া স্থানটির দিকে
> । আবেদ আলী অসস্থিবোধ করে । ‘ আচ্ছা ভাইসাব, ভাবী কি টিফিন বক্স দিয়ে ঢিল
> ছুড়েছিল ? আহা ! এভাবে কেউ স্বামী কে মারে ?’
>
> কোন উত্তর দেয় না আবেদ আলী । বরং তার মনে সন্দেহ দানা বাধে । টিফিন বক্স দিয়ে
> কপাল কেটেছে এটা শুধুমাত্র বৌ আর ছেলেপুলেরা জানে । আলাবক্স জানবে কিভাবে ।
> চশমার উপর দিয়ে সন্দেহজনক চোখে তাকিয়ে থাকে আলাবক্সে’র দিকে । পান খাওয়া ঠোট
> দুটি খয়েরি রং ধারণ করেছে । কথাগুলো জোর গলায় বলায় আরো অনেকে ভীর করে আবেদ
> আলী র টেবিলের চারপাশে ।
>
>  সন্দেহের চারাগাছ বাড়তে শুরু করে হরিণী বেগম কে বিয়ের পর থেকেই । নামের সাথে
> যথেষ্ঠ মিল আছে তার । এক মুহূর্ত সে স্থির হতে পারে না । সদা ছটফটে । হরিণী র
> সাথে আবেদ আলী র দাম্পত্য জীবনে দুই মেয়ে আর এক ছেলে । কিন্তু আবেদ আলী
> চেয়েছিল একটা বাচ্চা নিয়ে আর নেবে না । তাকেই ভালোভাবে মানুষ করবে । হরিণী কে
> বলায় সেও রাজি হয়েছিল ।
>
> প্রথম সন্তনের বয়স দু’বছর হবার পূর্বেই সে ফের কন্সিভ করে । সাথে তার গলায় একটি
> স্বর্ণের চেইন দেখা যায় ।  আবেদ আলী চেইনের কথা বলায় বলেছিল - বাবা দিয়েছে ।
> অথচ বাবা’র নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা । যাক সেটাও মেনে নেয়  । কিন্তু নিয়মিত
> কনডম ব্যাবহারের পরেও যখন তৃতীয় বার কন্সিভ করে হরিণী বেগম এবং হাতে দুটি সোনার
> বালা দেয়া শুরু করে তখন সন্দেহ না করে উপায় থাকে না । প্রশ্ন করলে উত্তর একটাই ‘
> বাবা দিয়েছে ’ ।
>
> তৃতীয় বাচ্চা যখন ছেলে হল শুনে আশ্বস্থ হয় আবেদ আলী । পরম আনন্দে বাচ্চা কে
> কোলে নিয়ে আৎকে ওঠে সে । বাচ্চাটার চেহারা হুবহু একই ফ্লাটের দোতলায় বসবাসকারী
> ভদ্রলোক সোবহান খানের মত । হাসবে না কাঁদবে স্থির করতে পারে না ।
>
>
>
> “ হেই ভাই, বক্স সাব রে কোনো দিন দেখেন নাই” । একজন ধাক্কা মেরে বলে । আবেদ
> আলীর ধান্দাটা কেটে যায় । কি বলবে সে ? বলবে যে, আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গে বৌয়ের
> চেচামেচিতে । গতকাল বেতন হয়েছে । সব টাকা বালিশের নীচে ছিল । হরিণী বেগম গুণে
> দেখে দু’হাজার টাকা কম । মেজাজ গরমের কারন এই । বছর শেষে কিসের দু’চার হাজার
> টাকা বেশী থাকার কথা ,সেখানে আরো কম। চোখ কচলাতে কচলাতে ডাইনিং স্পেসে এসে
> দেখে বৌ তার ছোট ছেলের টিফিন বক্স মুচছে । স্বামীর মুখ দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে
> হরিণী বেগম । “ বলি, বছর শেষে সবার বেতন বাড়ে তোমার কম কেন ” ? কোম্পানী লাভ
> করেনি এজন্য দু’হাজার টাকা কমিয়েছে । বাকী বাক্য শেষ হবার পূর্বেই উ করে ওঠে
> আবেদ আলী । বৌয়ের ছোরা টিফিন বক্সটা ডান কপালে লাগে । চোখটা বেচে যায় কোন
> রকম ।
>
>
>
> এসব কথা কখনোই কলিগদের বলা যাবে না । নিজের ফুটো প্রকাশ করতে নেই ,সেটা যত
> ছোটই হোক ।
>
>
>
> সাড়ে পাচঁটায় অফিস হতে বের হয় আবেদ আলী । বড় দিন । সূর্যটা ঠিকরে পরছে ঠিক
> কপাল বরাবর । কেটে যাওয়া স্থানটা টনটন করছে । বাসার পরিবেশের কথা চিন্তা করে
> মনটা বিষিয়ে ওঠে । ফলে বাসার পরিবর্তে পার্কের দিকে হাটা দেয় ।
>
>
>
> কোন বেঞ্চ ফাকা  নেই । জোয়ান,বুড়ো,অকালপক্ক সব বয়েসি জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে ।
> জোড়ায় যেন মহাশক্তি । অনেক খুজে একটি বেঞ্চ পায় । সামনে আবর্জনার স্তুপ । এজন্যেই
> ফাকা,ভেবে মনে মনে এক দমক হেসে নেয় আবেদ আলী । বেঞ্চে বসে সস্থিবোধ করে সে ।
> কাকের কর্কশ কন্ঠ ছাড়া কোন কিছুর শব্দ নেই । ওদের ঝগড়াঝাটি,খুনসুটি দেখতে দেখতে
> চোখ দুটি বুজে আসে তার । বোজা চোখে ভেসে আসে দুটি স্বপ্ন,একটি তার বৌয়ের
> সাথে ফ্লাটের দোতলায় বসবাসকারী সোবাহান সাহেবের পরকীয়ার রগরগে দৃশ্য অন্যটিতে
> সে এখন কোম্পানীর জিএম ।
>
> বৌ তার পরকীয়া করুক,সে এখন জিএম হওয়ার দিকেই এগোয় । দ্যাখে- সবাই তাকে সেলাম
> ঠুকছে । বেতন তার পঞ্চাশ হাজার । স্যুট-টাই পরে বসে আছে আরামদায়ক কেদারায় ।
> এসির মধ্যে থেকেও কৃত্রিমভাবে গা ঘামায় । ঠান্ডা পানির জন্য কলিং বেল টেপে । জুসের
> গ্লাস নিয়ে ঢোকে অফিসের সুন্দরী আয়া । ঠোটে টকটকে লিপস্টিক । হঠাৎ হোচট খেয়ে
> হাত হতে গ্লাসটা আবেদ আলীর টেবিলে পরে । জুস ছিটকে পরে তার কাটা স্থানে । একি
> জুস গরম কেন ? গরম লাগায় চমকে ওঠে । চোখ খুলে দেখে তার মাথার উপড় গাছের ডালে
> দুটি কাক বসে আছে । ঘেন্নায় রি রি করে ওঠে তার শরীর । স্যান্ডেল পরতে গিয়ে দেখে
> একপাটি নেই । যেটা পায়ে গলানো ছিল সেটা আছে অন্যটি হাওয়া । রাগ না করে হাসে
> আবেদ আলী ।
>
> দুই মাস আগে ফুটপাথ থেকে কিনেছিলো বাটা স্যান্ডেল জোড়া । বাসায় এসে দেখে ওটা
> বাটা নয় রাটা । এনিয়ে তুলকালাম কান্ড বাধিয়েছিল হরিণী বেগম । না থাক, এই মুহূর্তে
> হরিণী বেগমের কথা মনে করতে চায় না সে। উদোম পায়ে ফুটপাথ ধরে হাটে আবেদ আলী
> । উদ্দেশ্যহীনভাবে । তার কাছে মনে হয়, এটা স্বর্গীয় পথ-দু’পাশে বেহেশতী হুরেরা হাত
> বাড়িয়ে ডাকছে । কিন্তু সে জানে এটা ঈশ্বরের টোপ । লোভ দেখাচ্ছে । মধ্যবিত্তদের সবাই
> লোভ দেখায় । ফলাফল শুন্য । স্বর্গে তার লোভ নেই । তাই সে আবার যাপিত জীবনের পথে
> ধাবিত হয় ।
>
>
>
>
>
> হরংযধফংবষর৯@মসধরষ.পড়স
>
> ০১৭৬৮  ৭৯৪১৯১

ছোটগল্প:"বগা" -স্বপ্ননীল



















ছোটগল্প:"বগা"            -স্বপ্ননীল


ক্রমিক অনুযায়ী নিচের দিকে যেসব ছাত্ররা থাকে তারমধ্যে বগা একজন।পড়াশুনা তো মনদিয়ে করেই না উপরন্তু যত নষ্টের গোড়া বগা।কার চুল টানতে হবে, কার ব‌ই লুকোতে হবে,কার ব‌ই কালিদিয়ে জ‍্যাবড়াতে হবে,... সবের মূলে বগা।এহেন বগার স্কুল ইনস্পেকশনে এসেছেন ইনস্পেকটর।আগের দিন প‌ই প‌ই করে বুঝিয়েছে স্কুলের সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত সবাই।কিন্তু বগার কানে সে সব কথা ঢুকেছে কিনা একমাত্র বগাই জানে। সময়ে যে স্কুলে আসতে হবে বগা সেসব তোয়াক্কা করে না। প্রায়দিনই লেট করে। স্কুলটাকে যেন সে নিজের বানিয়ে নিয়েছে।তবে ইন্সপেকশনের দিন সময় মত বগা স্কুলে হাজির।ওর পোশাক-আশাক‌ও তেমন আহামরি নয়।যদিও স্কুল ড্রেস।তাতেও বগা একটু অপরিস্কার।শিক্ষকরা অনেকবার ধরেছে মেরেছে, কিন্তু কোন কাজ হয়নি।
সেদিন যথারীতি সবার মতো বগাও ক্লাসে বসেছে।পিছনের থেকে একবেঞ্চ আগে।ইন্সপেক্টর ক্লাসে আসতেই ওরা সবাই উঠে দাঁড়াল।কিন্তু বগা বসে।পাশে বসা বন্ধুটি ওকে খোঁচা দিচ্ছিল দাঁড়ানোর জন্যে।উল্টে বগা ওর প্যান্ট ধরে টান মারল।বলল-ওই,বোস!
অবশ্য ইন্সপেক্টরের নজরে আসেনি ব‍্যাপারটা।
সবাই যে যার সিট নিল।সবার ভয় বগাকে নিয়েই।ওদিকে জানলার বাইরে অপেক্ষারত বিজ্ঞানের স্যার।বাইরে থেকে নজর রাখছে বগাকে।

ক্লাসে এসে প্রথমে সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন ইন্সপেক্টর।সবাই হাসি-খুশি। সেই খুশীতে বগাও কিছুটা সুর মেলাতে চাইছিল। কিন্তু পাশে বসে থাকা বন্ধুটি এক্ষেত্রে ওকে নিয়ন্ত্রন করল।
এবার ইন্সপেক্টর জল নিয়ে একটু ভূমিকা টানার পর প্রশ্ন করলেন-বলতো, জলের অপর নাম জীবন কেন?
প্রশ্ন শুনে ছাত্র-ছাত্রীরা হাত তুলল।বগাও তুলেছে।বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক ফিসফিসিয়ে বললেন-বগা, ঠিক জানিস তো?
      বগা বাইরের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে হ‍্যাঁ সূচক সম্মতি জানাল।কে জানে? নিজে নিজেই শান্ত্বনা​ নিল বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক। ওদিকে বগা যেন হাতটা আরো খানিকটা উঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করল।ওর গলার শিরাগুলো খেঁচে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বলার জন্য মরিয়া প্রয়াস।উত্তরটা  যেন ওকেই বলতে বলা হয় এরকম একটা ভাব।।কিন্তু সামনের দিকে বসা এক ছাত্র প্রশ্নটার উত্তর দিল।না বলতে দেওয়ার জন্য বগার খুব আফসোস।যাঃ! মনেমনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।এমন ভাব যেন বগা জানত‌ই।

আবার পরের প্রশ্ন-জলের উৎস কি?
সকলের সঙ্গে এবার‌ও বগা হাত তুলেছে।কে জানে, ওর মনে কি চলছে।-বলার জন্য বগা যেন অর্ধেকটা দাঁড়িয়ে উঠল।তবু ইন্সপেক্টরের চোখ ওকে এড়িয়ে এবার‌ও অন্য একজনকে জিজ্ঞেস করলেন​।বগার মনে তীব্র অস্বস্তি। একটা চটাস্ শব্দে নিজের হাতের চেটো দিয়ে বেঞ্চটাতে আঘাত করল। ওদিকে বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক ওর এই আচরণে কটমট করে তাকাল।যাতে বগা একটু ভয় খায়।
যে বগাকে সারাবছর আদর করে ,মেরে ধরে বোঝাতে পারেনি,সে যে এমন চোখকে ভয় করবে এ আশা বৃথা।বরং মুখটাকে নম্র করে একটু হেসে ফিসফিসিয়ে ঈশারা করলেন -সামনে দ‍্যাখ।
আবার পরের প্রশ্ন-আমাদের জীবনে জলের গুরুত্ব কি?
এবার বগা লাফিয়ে উঠে অনেকখানি হাত উঁচিয়ে আগবাড়িয়ে বলল-আমি বলব স‍্যার।বলে ইন্সপেক্টরের​ দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল।
বগার এহেন অভিপ্রায়ে সবাই স্তম্ভিত।ইন্সপেক্টর বগাকে বলার নির্দেশ দিলেন।
বগার জামাটার সামনের দিকের তিনটে বোতাম নেই।শুধু উপরের বোতামটাই যা আছে।নিচের দিকে একটা গিঁট মেরে রেখেছে।বগা জামাটা এদিক-ওদিক টান দিতে দিতে উঠে দাঁড়াল।ছাত্র শিক্ষক সবাই বগার দিকে তাকিয়ে।কি করবে বগা?বগা যদি সত্যি সত্যি না বলতে পারে?প‌ইপ‌ই করে কাল ওকে বুঝিয়েছে। এমনকি একদিন ইস্কুল না আসলেও অসুবিধা নেই। তা সত্ত্বেও আজ ইস্কুলে আসল।অথচ এমনি‌ই কত কতদিন ইস্কুলে আসে না।তবুও তো ঠিকই ছিল,ও যদি ওভাবে নিজেকে আগবাড়িয়ে না বলত তাহলে হয়ত এবারেও অন্য কেউ...?
কি করবে বগা?বগা যদি সত্যিই​ বলতে না পারে। স্কুলের মান সম্মান... উঃ আর ভাবতে পারছিনা।
জানলার ওপাশ থেকে বিজ্ঞানের স‍্যার প্রথম থেকেই দাঁড়িয়ে।সমানে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন।বগাকে নির্দেশ করে বললেন-বগা,বল।-যা জানিস বল।
কথা শুনে বগা একবার জানলার দিকে তাকাল।সেই ফাঁকে আরো একবার জামাটা ঠিক করে নিল নিজের।ওর নিরুত্তর দেখে ইন্সপেক্টর আবার বললেন-কি হল?...বলো?
বগা এবার শুরু করল। একেবারে পঞ্চম সুরে।...আমাদের জীবনে জলের গুরুত্ব অনেক।যেমন, বাবা যখন কাজ করতে করতে জল তেষ্টা পায় তখন যদি জল না পায় খুব কষ্ট।আবার মা যখন ভাত রাঁধে তখন‌ও জলের দরকার হয়।সন্ধেবেলা হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হয়।-তখন‌ও জল লাগে।
উত্তর শুনে ওদিকে বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষকের মাথায় হাত।যাঃ! সব শেষ করেদিল বগা।ওর উত্তর শুনে ওর সহপাঠিরাও মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল।ইন্সপেক্টর‌ও বগার উত্তর শুনে হাসি চাপতে না পেরে বগার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন​ কিছুক্ষণ।বগা এক এক করে বলছিল।এবার বগাও একটু থামা দিল।বাইরের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইন্সপেক্টর ওর দিকে তাকিয়ে বললেন-শেষ?
না স্যার, আর একটা আছে।
ওর কথা শুনে সবাই থ।মনে মনে ভাবছিল কখন শেষ করে বগা।...
বলল-আমার পাশের ঘরের পুটু ঠাকুমার একটি মাত্র ছেলে।বাইরে থাকে।অনেক টাকা।পাকার ঘর।মাসে মাসে মাইনে পাঠায়।আর পুটু ঠাকুমা সেই টাকায় এটা ওটা কিনে খায়।যখন নিজে যেতে না পারে আমি মাঝে মাঝে কিনে নিয়ে আসি।অবশ্য তারজন্য আমাকেও ভালবেসে কোনবার বিস্কুট, কোনবার পাঁউরুটি, কোনবার চকলেট দিত।আমিও সেই লোভে যখন তখন গিয়ে বলতাম-তোমাকে যেতে হবে না।দাও কি আনতে হবে।আমি এনে দেব।কোন কোনবার আনতে গিয়ে ইস্কুলে আসতে দেরি হয়েছে।তারজন‍্য একঠ‍্যাং কোনদিন বা মার খেয়েছি।কিন্তু লোভ সামলাতে পারিনি।
কিন্তু এসব কথার সঙ্গে জলের কি গুরুত্ব কেউ বুঝে উঠতে পারেনি।না ছাত্র,না বাইরে অপেক্ষারত শিক্ষক,না ইন্সপেক্টর।তবু কি বলতে চাইছে বলুক।বাধা দিলনা ইন্সপেক্টর।
বগা বলল-সেদিন পুটু ঠাকুমার খুব জ্বর।আমি গিয়ে মাথা টিপে দিচ্ছিলাম।পা-টিপে দিচ্ছিলাম।তাতেও কমেনি।জ্বরে গা-হাত পুড়ে যাচ্ছিল।লেপটাকে আচ্ছা করে জড়িয়ে দিলাম।গা'টা খুব কাঁপছিল।
পুটুঠাকুমা বালিশের নিচ থেকে একটা কাগজ আমার হাতে দিয়ে বলল,এই ঔষধটা আন।
আমি শুনা মাত্র‌ই এক দৌড়ে গেলাম দোকানে।প্রাণপনে ছুটে গেলাম।যেন বাতাসের মত গতি পেয়েছিলাম তখন।নিমেষের মধ‍্যে পৌঁছেগেলাম দোকানে। কাগজটা দিতেই ঔষধগুলো এক এক করে দিল।এরপর দোকানদার জিজ্ঞেস করল -কিরে, চকলেট না বিস্কুট?সেদিন আর চকলেট বা বিস্কুট কিছুই কিনতে ইচ্ছে করল  না। হাঁপাতে হাঁপাতে ঔষধ নিয়ে ফিরে এসে দেখি পুটুঠাকুমার মুখদিয়ে ফেনা বেরাচ্ছিল।আর জল জল বলে খুব আস্তে আস্তে বলছিল।আমি ছুটে গিয়ে গেলাসে করে জল আনলাম।কিন্তু পুটুঠাকুমা ততক্ষণে আর নেই।
   আমি যদি ঠিক সময়ে জল দিতাম তবে আজ ক্লাসের বন্ধু টুকাইয়ের কাছে একটা চকলেটের জন্য মারখেতে হত না।
       কথাগুলো বলে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বেঞ্চিটাতে বসে পড়ল বগা।
      ক্লাসঘরটা মুহূর্তের মধ্যে যেন থম হয়েগেল।কারো মুখে হাসি নেই।বাইরে বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই তখনো নির্বাক দাঁড়িয়ে।ইন্সপেক্টর এগিয়ে এলেন ওর কাছে।ওকে জড়িয়ে ধরলেন​ বুকে।সঙ্গে সঙ্গে গোটা ক্লাস ঘরটা যেন খুব ভার হয়ে গেল।
                         
                              সমাপ্ত

গল্পকার-স্বপ্ননীল
ঠিকানা:
সিতিবিন্দা/সাহড়দা/পিংলা/পশ্চিম মেদিনীপুর/৭২১১৩১/পশ্চিমবঙ্গ/ভারতবর্ষ।

শাহজাহান সিরাজ শাহীন এর কবিতা

“সংক্ষিপ্ত পরিচিতি”
নাম ঃ শাহজাহান সিরাজ শাহীন
পিতাঃ খায়রুল ইসলাম, মাতাঃ শাহাজাদী বেগম
জন্ম স্থান ঃ রামদাস ধনিরাম (উলিপুর পৌরসভা),
উপজেলাঃ উলিপুর, জেলাঃ কুড়িগ্রাম।

জন্ম তারিখ     ঃ ১০ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮খ্রি.
পেশা        ঃ ব্যবসায়ি
লেখাপড়া     ঃ প্রাথমিক শিক্ষা ঃ গুনাইগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।
  মাধ্যমিক শিক্ষা ঃ গুনাইগাছ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।
          উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ঃ মেধাবিকাশ টেকনিক্যাল এন্ড বি,এম কলেজ, জুম্মাহাট, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।
শখ         ঃ অবসর সময় ফেসবুক, গান শোনা, বইপড়া ও লেখালেখি করা।
বর্ণনা         ঃ শৈশব থেকে লেখালেখি শুরু করে। কবিতা, গান, ছড়া, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস লেখা।
অংশগ্রহণ     ঃ ছোট নদী, স্বপ্নভূমি, দৈনিক সকালের কাগজ, বাংলা কবিতার আসর (শাহজাহান সিরাজ নামে),
  নবগঠিত ‘উলিপুর সাহিত্য পরিষদে’ কবিতার আসরে অংশগ্রহণ করেন।
ইচ্ছা         ঃ তাঁর অপ্রকাশিত কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ, গান ও উপন্যাস প্রকাশ করা ও সারাজীবন সৃষ্টিশীল
           কাজের সাথে লেগে থেকে পরলোগমন করা।

ই-মেইল ঠিকানা     ঃ ংযধযলধযধহঁষরঢ়ঁৎ৮৮@মসধরষ.পড়স, ঋধপবনড়ড়শ : শযধষরফংরৎধল৩৭০
  মোবাইল ঃ ০১৭৮১০২১৯৩৩, ০১৮৩৫০৩১৮৮০।

-০১-
স্মরনীয় যারা

যুদ্ধাবেশে আছি বলে-
যুদ্ধক্ষেত্র পরিবর্তন করে,
প্রেরনার ইতিহাসের নেশায়
চেতনার বাজারে বিনিয়োগ করা।
স্বেচ্ছাবস্থা হতে-
দেশদ্রোহী জঘন্য কীটরে,
অন্তঃস্বত্ত্বারে নিঃচিহ্ন করে;
যৌবনাশক্তিকে তপ্ত জলে বাষ্প করে,
নীলাকাশের মেঘের ভেলায় পূর্ণজন্মে গড়ি আগামী প্রজন্ম..।
বীরত্ব আছে বলেই-
পেয়েছি রক্তাক্ত লাশের গন্ধ,
অমোড়া দেহাবসান দাপন করেছি ‘গণকবরে’।
জ্যান্ত রেখেছি শুভাকাঙ্খীর কাতারে,
গর্জে উঠেছে- ‘পবিত্র আমিন ধ্বনি’।
অশ্রুসিক্ত নয়ন মুছে-
সাত্ত্বনা পেয়েছি; আমরা বীরের জাতি, স্বাধীনতা এনেছি...।

-০২-
রক্তদাতা

অসুস্থ মা আজও জীবিত, রক্তদাতার দ্বারে একফোঁটা রক্তের দাম দিতে পারিনি;
শত শহীদের রক্তের মূল্য কেমনে শু’ধব।
তব শ্রদ্ধায় মাথা নত করি, মহানুভবতার মূল্য বুঝে।
প্রতিটি ক্ষণ কেটেছিল অসহ্য যন্ত্রনায়, নাওয়া-খাওয়া ভূলে,
অসমাপ্ত পরিধি ডিঙ্গিয়ে পরিত্রাণের আশায় রোগমুক্তির হাতসানিতে,
শুধু ছুটে চলেছি মানবতার দ্বারে দ্বারে....।
পরিহাসে কাল নাগিনী, ছোবল মেরেছে অভিশপ্ত দেহে,
এ নাকি ‘পাপের ফসল আঘাত করেছে জন্মদাত্রির দেহে’।
কখনো ভেবেছি নিষ্পাপ শিশু পৃথিবীর আলো না দেখেই জন্ম,
মাতৃকোল হারা দেহাবসনে- তাদের অভিশাপ কী মাতা-পিতা?
নাকি, অজন্মার কালোছায়ে বিভোর, ঘুটঘুটে রাতের সমাজ-সংসারের কালোমায়া-
পথভোলা বিপদগ্রস্ত নাবিকের পথচলা..।
কখনো ভেবেছি- শত শত অসুস্থ রুগ্নদেহ পড়ে হাসপাতাল নাম বিছানায়,
প্রতিটি জীবন কী অভিশপ্ত, না-কি পরীক্ষার রুমের ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে যাওয়া সময়;
ফলাফলের ভীতিতে, হেদায়াতের করুণ চাপে- ক্ষত যন্ত্রনার কারাগারে শায়েস্তা হওয়া..।



-০৩-
হারিয়ে যাই

হারিয়ে যাই- কোন এক অজানা পথ ধরে,
হারিয়ে গেছি- হাটতে শিখে, পথের শুরুটা সৌখিনতার রসে-
অথবা পিপীলিকার কামড়ে নিঃশেষ হতে দেখে;
পিছু পথ হঠতে বাধা শত শত সম্মুখে আহবান-
‘পিছু ফেরার সুযোগ কোথায়’।

হারিয়ে যাই-স্বপ্ন ডানায় ভর করে উড়তে শিখে,
যে ডানা ভেঙ্গে খড়কুঠোর মতো দরিযায় ঝাপ মারি,
ভেসে চলি, অনাদরে-শেষ অবলম্বন হয়ে বাঁচতে শিখে...।
আপন স্বত্ত্বাকে বিলিয়ে দিয়ে, কটোক্তির ছোবলে রোগাক্ত দেহে-
কলঙ্ক মোচনের তিক্ততা পেয়ে, অট্টহাসিতে ধিক্কার পুষে...।

-০৪-
“ভূতের মেয়ে”

ভূতের বাড়ির ভূতের মেয়ে, পাতবে সম্বন্ধ কিবা দিয়ে
চলে যদি দর কষে।
পড়শী জনে কিবা শোনায়, বিয়ে বুঝি যায় ভেঙ্গে যায়
প্রীতিবর- ‘চরকি দোলায় বসে’।

চাপার জোরে যত বাপা, ভীতির ভাঁড়ে কাঁপা কাঁপা,
এই করো না সেই করো না।
ছিকে যদি যায়রে ছিড়ে, বাংকি বহে লাভ কী ফিরে,
মিছে স’য়ে যন্ত্রনা।

ভূতের নানির কানাকানি, যার মেয়ে তার জানাজানি,
মেয়ে গো- ঘরের বাইরে যেও না।
যারা ভূতে ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়, সেও যদি নিজেই পালায়;
তব মিছে বিয়ে- ‘সংসার গড়ার বাসনা’।

ঘটকের খেয়ায় গড়াগড়ি মায়া, আশ্রয় গড়ি কোনবা ছায়া,
অজানা কোন দেশে।
বোবার ভাষায় গান ধরালে, পরের তরে কাঁদতে শেখালে,
কী বা মধুর রসে।

কত অনাদর বিষদাহ ঘোর, কাটির জোর আর খুঁটির জোর
গড়ে করুণ বসতি।
রুদ্ধ দিশারী বন্ধ দুয়ারি, বৃত্তচক্রের শূন্য বাহারি
পূর্ণ্য ভরতি।

বাইরে সুশ্রী সদা ফাটফিট, গহীনে জঘন্য অরন্যের নগন্য কীট,
আর কত প্রজাপতি।
বসত করে ভিন্ন গুণে, নাক ছিটকায় ঘিনঘৃণে
নষ্ট মতের ভিন্ন প্রজাতি।

এমন আর্বজনা হলে গো তুমি, মিথ্যে মরিচিকায় বসতভূমি
ডাস্টবিনে জায়গা হয় না।
অনাদর শুধু বেড়েই চলে, বহি তব নদীর জলে,
শেষবেলা, সঙ্গীহারা যন্ত্রনা।


-০৫-
‘দোহাই’

আলসয়িা মানষরে (মানুষরে) আগ  বশে,ি
কুরয়িা (অর্কম্মা) মানষরে ভোক (ক্ষুধা) বশেি
ফল খলেে তো ফলরে বচেনো করলে শষে ।
হবে ছাওয়া (সন্তান) ডাকবে বাপ (বাবা)
তার নাম রাখবে কালাচাঁদ
পড়শীর জয়ধ্বন-ি গাইছ, গাও বশে।
হাগড়ি (পায়ূবধি) পলেে ছল,
হাগয়িা করছে সারা মাচার তল।
ভাবী বল-ে জানো না হাতী করল,ে
হাতীর চারা আগে আনতে হব’ে।
মছিে কনে গল্পরে জোড়া, যা-তা কনে কব।ে
দাদীর মুখে শোনা কথা, তোমারে বলে যাই।
নীতি কথার খোরাক মটে,ে মাঝরে ঠ্যাং ধরি পালাই।

শোন- ‘মনেি গাইরে মনেি গাই, দুধ দ্যাউস ন্যা ক্যা?
আকোয়ালে ঘাস খোয়ায় ন্যা, দুধ দ্যাং মুই ক্যা।
আকোয়াল রে আকোয়াল, ঘাস খোয়াস ন্যা ক্যা?
কলা য্যা থোরায় ন্যা, ঘাস খোয়াং মুই ক্যা?
কলা রে কলা, থোরাইস ন্যা ক্যা?
দ্যাওয়া য্যা চলেকে ন্যা, থোরাং মুই ক্যা।
দ্যাওয়া রে দ্যাওয়া, চলিকসি ন্যা ক্যা?
ব্যাংগে য্যা টোর টোরায় ন্যা, চলেকোং মুই ক্যা?
ব্যাং রে ব্যাং, টোর টোরাইস ন্যা ক্যা?
সাপে য্যা গলিি খ্যাব,ে টোর টোরাং মুই ক্যা?

/প্রেমের কবিতা/
-০১-

“কতটা”

কতটা শোক পেলে মানুষ-
স্মৃতির কথাগুলো নেড়েচেরে বলে,
নয়ন জলে বুক ভেজায়।
অন্ধকার একাকী গৃহরে সঙ্গী করে,
নিজেরে সাত্ত্বনা দিয়ে চলে,
নিঃস্তব্দ ভাবনার মেঘ হাবুডুবু খায়।
কতটা যাতনার যাতাকলে পিষলে মানুষ,
ক্ষতঘাতে ছটফটে মরে, যন্ত্রনায়দাহে কাতরায়।
দৈহিকশক্তি নিস্ফল হয়ে, বেদনার বিষফলে কন্ঠদ্বারে,
আবেগে অনুভূতি সঞ্চরায়।
কতটা পিছু হঠলে মানুষ,
অস্তিত্বেরে বিলিয়ে দিয়ে, নিরাশার দাহে পা বাড়ায়।
পদাঘাতে সংকীর্ণ ভুবন, কারাগারে করে আত্মগোপন-
দেহতন্ত্র জপে নিরুপায়।
কতটা দৌড়ক্ষম আছে মানুষের,
সু-কৌশলের পদাচারনায়, পরিকল্পনার মাপকাটি নিয়ে
সচেতনতার গম্ভীরতায়।
বড়াই শুধু পারি-পারার, মুখের ভিতর গড়ি-গড়ার
সুরক্ষার বাস্তবতায়।
কতটা আয়ূ পেয়েছে মানুষ
হাওয়ার চরে ভাসি ভেলা
চলছ কোথায় অচীনপুরে-
এ কথা গাটের একেক বেলা।
মজার জালে ফান্দে সদা, কী ঘটে কখন কেবা জানে
অদৃশ্যের তরীতে আত্মভোলা।

-০২-
দেখেছি তোমায়

দেখেছি তোমায়- ভালবাস আমায় কেমন করে,
ডুবেছি তোমার প্রেম গভীরতার শতভাগ জলে।
ভালোবাস তুমি কেমন করে।
দেখেছি তোমায়- লাইনচ্যূত পথে রেলের গাড়ি,
ধ্বংস উনুনে জ্বলে কেমনে, পরে ঠেলায় কাষ্ঠফাড়ি।
দেখেছি তোমায়-
বাঁচা মরা সমান করে বাঁচতে শেখা,
কাপুরুষ নই, তাই ভেবে ভেবে,
আত্মক্রন্দন আধারে জলাঞ্জলি দিয়ে;
লোকসমাজে হাসতে দেখা।
দেখেছি তোমায়- অনেক ভালোরে এড়িয়ে যেতে,
মধ্যবিত্ত বলে বাধার-প্রাচীরে
কত কিছুতেই মাথা নুয়াতে।

-০৩-
স্বেচ্ছাকবর
দীর্ঘশ্বাস বুকে চাপা কান্না,
হুংকার ছাড়ে শত বায়না,
চালায়- মরণ মরণ খেলা।
ধুকে ধুকে মরা, পাঁপড়ি ঝরা
মায়া কান্নায় অন্তর জ্বালা।
কাষ্ঠে ভাসা ভেলা..........
দেহাবসান হলে পরে বাঁচি,
শত মরনের জ্বালা।
নামেমাত্র রক্তের বাঁধন,
শুধুই বাড়ায় হৃদয় যতন
কথা ছুরিতে অস্ত্র-পাচার;
হলাম আত্মহারা।
রসে হাড়িতে বিষের পেয়ালা,
নাড়ি-চারি বাড়ায় শুধুই হেলা....
সংকীর্ণতার বিষম ধারা।
পাথর ঘষে শিমরে বাড়ী,
যত না সাজাই আপন করি,
পাথরই রয়ে যায়।
কোন কোলেতে কার বা লালন,
কেমনবীজে কেমন ফলন,
মরি গো যাতনায়।
দগ্ধ-প্রেমের ছটফটানি,
চালাও বাদর নাচন পালা,
দেহাবসান হলে পরে বাঁচি...
শত মরণের জ্বালা।

-০৪-
তুমি তো সেই

তুমি তো সেই,
যাকে সাত্ত্বনার দেই মানসিক যন্ত্রনা,
লাঘবের তরে; শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে-
মনোপিঞ্জনে আরতি করি,
জীবনের অভিধান ভাবি।
তুমি তো সেই,
যাকে লালন করেছি ত্রিশ বছর ধরে,
লালসের খোসলে বাঁধন মতির ছল;
কার্যসিদ্ধির পরশে গোলক ধাঁ-ধাঁ বিস্তার-
ভীতিতে কর্মগুনের সঞ্চারন জাগাও;
এমনি তোমার পদতলের পাদচিহ্ন....।
তুমি তো সেই-
যাকে দেখে ভালোবাসতেও শিখিনি,
প্রেম-ময়তা কেমন তা শুয়েও দেখিনি;
শুধু যন্ত্রনার আড়ালে গাঁ ঢেকেছি।
আধারের বালিম চাপায় কাঁদতে শিখেছি..।
তুমি তো সেই-
যে কিনা ঝড়ো রাতের বজ্রপাত,
রিমঝিম শব্দগুনে গৃহের এককোণে বসে,
কাতরানোর ভোগ- হয়তবা; কালবৈশাখীর ধ্বংসলীলায়-
গর্জে উঠে সর্বনাসা অভিশাপ.. ।
তুমি তো সেই-
যে কিনা শোধরায়নি স্বভাবচিত্ত,
সর্পবৃত্তে শুধু খোলস বদল-
বিষদাঁতে বিষফোঁড়ন, এখনো জীবন্ত...।

-০৫-
‘নরিূপায় কুয়াশায়’

হঠাৎ মাথা ঘুরে আঁখরি দু’গৃহে দুয়ার মলে,ে
উত্তাল হাওয়া বরেয়িে পড়ে দূবলতার কালোমঘে;ে
ভাবরে সন্যাসী ভাবয়িে তোলে কী দখেলাম !
ঔই দূর নীলমিায়- পাক মারে শকুনরে দল,
শকিাররে সন্ধানে হংিস্র মানব, বধিবে নরিহ প্রাণ।ে
হয়তবা ঘটইে যাব-ে ‘চোরে চুরী কর,ে সাধুর বন্ধদিশা’।

সইে বষিখকেো আঁখ-িযুগল, তীক্ষ্ম নজরে চাহ,ে
থমকে কলজিা ছাৎ করে উঠ,ে জটরে ধরা মাতৃ-বক্ষ পঞ্জির।ে
এইবুঝ,ি নাড়ি ছড়ো ধন, আপন দৃষ্টরি আড়ালে হারয়িে যাব,ে
নষ্ঠিুর হয়িার ছোবল-ে এতদনিে মায়া-মহব্বত ছন্নি কর;ে
ছোট্য গৃহরে মাটি চাপায়-ঘুময়িে যাবে পছিু ফরিে তাকার বাদ।ে

অনুভূতরি নঃিসঙ্গ বায়ূ আবার কড়া নাড়,ে
হঠাৎ চমকতি হই; এই বুঝ-ি চাহদিার যাতাকলে ক্ষুধা নবিারণরে আঘাত এলো,
অসহায় হলো শষে সম্বলটুকু হারয়ি।ে
তবুও কনে জান?ি
চাতক পাখরি মতো চয়েে থাকা।
হয়তবা এদকি-সদেকি লুকয়িে ফরো,
জীবন হারা প্রদীপরে মত হাত-পা নড়েে মৃত্যুকে আঙ্গগিন করা।
তবুও বোবার মুখে এক ছ’টা শব্দ এলো না,
নঃিশব্দ যন্ত্র-মানব বকিল হয়ে পড়ইে থাকল...।

কখনও বা নাটকরে মঞ্চে স্ব-প্রতীমা জাহরি করা,
আপনায় প্রতচ্ছিায়া দখে,ে
আপন ছলে আপনারে ধক্কিার দতিে শখো
হয়তবা এই আমি আমার মতো নই.....।

 






পরিবর্তনশীল আধুনিকা সন্দীপ দাস





















লেখক পরিচিতি :- 


নাম:      সন্দীপ দাস
পিতা:    সদানন্দ দাস
মাতা:    ভারতী দাস
ঠিকানা:    রূপনগর , রূপনারায়নপুর , আসানসোল , বর্ধমান , পশ্চিমবঙ্গ , ভারত
জন্ম:       16-09-1987
শিক্ষাগত যোগ্যতা:    বি.এ. (ইংরেজি)
পেশা:       চাকুরী 
প্রকাশিত গ্রন্থ:   হারানো কথা ( 2017 ); এছাড়া বাংলাদেশের দুটি জায়গায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ।
অর্জিত পুরস্কার:      নেই
লেখালেখি শুরু:     2007



(১)

পরিবর্তনশীল আধুনিকা 
১।।

গল্পটি শুরু করার আগে বলে রাখা ভালো , কারুর জীবনের ঘটনা এ প্রকার হতেও পারে আর নাও পারে । তবে হলে , লেখকের দায়িত্ব খুবই কম , কারণ এ নিছক এক পুরানো বন্ধুর থেকে শোনা তারই জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । শুনে বিশ্বাস হয় না , সময়ের সাথে সাথে চেহারা এক থাকলেও মানুষ বদলে যায় কীভাবে ? কিভাবে একজন সহজে অস্বীকার করতে পারে কারুর সাহায্য , যা কোন একদিন জীবন মৃত্যুর মাঝে ঝুলে থাকা কাউকে বাঁচিয়েছিলো । আজ সে সম্পূর্ণ সুস্থ , নতুন জীবন শুরু করার মুখে ।  সে আজ সুস্থ এক ব্যক্তি  , তবু ভুলে গেছে সেদিনের শুভ কে । আজ্ঞে হ্যা ! আমার বাল্য বন্ধু শুভ দত্ত । দেখতে লম্বা , ছিমছাম চেহারা , কিন্তু ভাগ্য ততটাই ছোট । অপরের সাহায্যে কোন দিন পিছু পা হতে দেখিনি তাকে । আজ হঠাৎ দেখা ধর্মতলার মোড়ে । ব্যাস , সোজা তুলে নিয়ে গেলো আমায় তার বাড়ি , আমতলায় । বললো দু দিন থেকে যেতে হবে । না ! আবদার ফেলতে পারি নি আমি । আর এতো দিন পর কাকিমার হাতের রান্না আমিও চাই নি মিস করতে । সুতরাং থেকেই গেলাম । 
আজ শনিবার । ওদের আবার নিরামিষ । তবে কোলায়ের ডাল আর আলু পোস্ত দিয়ে ভাত ; উফ সে যেন অমৃত । এ যুগেও যে এভাবে খাওয়াতে পারে কেউ , না গেলে সে পুরোনো বাঙালিয়ানা খুঁজেই পেতাম না কোনদিন । যাই হোক , খাওয়া পর্ব শেষ । এবার বিশ্রামের পালা ।।
শীতের দুপুর , বাইরের রোদে বসে বসে দুই বন্ধুর সে এক জমজমাটি আড্ডা । বললাম , ভাই শুভ , কি করছিস এখন ? সেই এম সি এ করে কলেজ ছাড়ার পর এই দেখা । অনেক বদলে গেছিস এতো বছরে । 
শুভ এক গাল হাসি মুখ করে বলে উঠল , টি সি এস এ একাউন্টস সামলাই । দারুন চাকরি । কথায় কথায় অনেক কথাই হলো , অনেক কথাই বললাম তাকে । জানলাম , স্কুলের বন্ধুরা এক এক করে বিয়ে করে নিয়েছে , সবাই প্রায় ওয়েল সেটল । রাগ হচ্ছিলো নিজের ওপর । আমরা দুই বন্ধুই বুঝি দুটো পাকা ধ্যারোস । কিছুই পারি না । 
শুভ নিজের জীবনের অনেক অন্তরঙ্গ এপিসোড শোনাচ্ছিলো । হটাৎ ওকে থামিয়ে , আমি বলে উঠলাম , হ্যারে , সেই পাগলির কি খবর ? বেশ হত্চকিয়ে উঠে বসলো সে । শুভর মুখ দেখে মনে হচ্ছে , রাগে দাঁত কিরকির করছে ওর । বেশ জোরে বলে উঠলো শুভ , শুভশ্রীর কথা মুখে আনবি না আর । ওর মতো দু নম্বরি আর দুটো দেখি নি । জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম রে ওর , আজ এই পরিণাম দিলো । বেশ অবাক হলাম শুনে , যে শুভ এই শুভশ্রী কে প্রানের থেকে বেশি ভালোবাসত , যাকে ছাড়া শুভর দিন হতো না , রাত হতো না , তার সম্বন্ধে এই মন্তব্য । তাও শুভর মুখ থেকে , ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছিলো না আমার । কি এমন হয়েছিল , ঠিক করলাম এই দু দিনে জেনে ফিরবই ।
বেশ কবার এ বিষয়ে শুভকে জিজ্ঞাসাবাদ চালালাম , তবে ও এতটাই রেগে ছিল শুভশ্রীর নামে যে এক ফোঁটাও বেরোলো না ওর পেট থেকে । সুতরাং , দিবা নিদ্রা হয়ে যাক একবার , রাতে আবার ফেলু মিত্তির হওয়া যাবে ।।

২।।

সন্ধ্যে বাতি জ্বলে উঠেছে সারা আকাশ জুড়ে । এতো দিন পর দেখা শুভর সাথে আর হালকা নেশা হবে না , তা হয় নাকি । সন্ধ্যে বেলার আড্ডা তাই কে এফ সি র সাজানো বাগানেই কাটানো যাক । হাতে গোল্ড ফ্লেক বড় একটা । টেবিলে সাজানো গেলাস । অনেক দিন পর টান দিলাম । শুভর মুড দেখলাম এখন বেশ ভালো । মনে মনে গুনগুনিয়ে গান করে চলেছে । বেশ ফাইন গলা তো , আমি বলে উঠলাম । নীরব গলায় আস্তে করে শুভর জবাব , পাগলিটার এই টুকু স্মৃতি আজও রয়ে গেছে রে । বুঝলাম , ভালোবাসার ঝর্ণা এখনো ঝরে পরছে শুভর বুক থেকে , ভালো লাগলো তবে কৌতুহলটা আরো চেপে ধরলো আমাকে । দুপুরের ঘটনাটা কি নিছক কোনো ছলনা , নাকি সত্যি শুভর ঐ রূপ । জেদ চেপে ধরলো এবার , জানতেই হবে কি ব্যাপার ।।
সুরটা বেশ পরিচিত , " দেখা হলে বলে দিও আজও বেঁচে আছি "। একটু ডিসটার্ব করে শুভকে এবার একটু লেগ পুল করে বসলাম । " কিরে প্রেম যে আর ধরে না , তবে দুপুরে যে অভাবে দাঁত খিঁচিয়ে শুভশ্রী র চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করছিলিস যে " । শান্ত ভাবে শুভ বলে উঠলো , ভালো সে আজও বাসে ওকে , বাট , মাস খানেক আগে ও যে ভাবে ব্যবহার করেছিল শুভর সাথে , ঠিক বিশ্বাস হয়নি শুভর । এতটা বদলে গেল মেয়েটি । 
আমার ও বিশ্বাস হচ্ছিলো না , শুভর কথায় । শুভ মেয়েটির জন্য যা করেছিল , আমি তো দেখেছি । দিনের পর দিন ওর পাগলামো সামলেছে , বিয়ে না করেও মিথ্যা বরের অভিনয় চালিয়ে গেছিলো শুভ । নিজের ভালোবাসা ভুলে শুধু মেয়েটির জীবনের চিন্তা করে গেছিলো । এটা আজকের দিনে কজন করে , বলতে পারো ।।
রাত এখন দুটো বাজে , ঠিক ঘুম আসছে না । একদিকে নেশার ঘোর অন্যদিকে শুভশ্রীর আর শুভর সেই কলেজ দিনের গপ্প গুলো ভেসে উঠছে চোখের সামনে । কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে শুভশ্রী । ধপধপে ফর্সা , হেভি স্মার্ট । অন্যদিকে শুভ , লাজুক ছেলে , মেয়েদের ছোঁয়া থেকেও লজ্যা , এমন ছেলে জন্মে দেখি নি । তবে শুভশ্রীর প্রতি হেভি টান ওর । বন্ধুত্ব ও হয় , বেশ গভীর । একসাথে ওঠা বসা । দিন রাত তখন কলেজে একটাই চর্চা , শুভ আর শুভশ্রী । ভাবতেও পারছি না এই শুভ আজ ঐ নাম শুনলে রেগে যাচ্ছে । অবাক কান্ড ।।
দিন ঘুরতে লাগলো , সেদিন কলেজ ফাংশান । স্টেজে তখন শুভশ্রী উঠেছে , গান শোনাবে সে । অসাধারণ গলা , বলে বোঝাবো কি করে । আর অন্যদিকে একদম সামনের সারিতে সেই চেনা মুখ , মি.রোমিও , শুভ । ভাবতাম ব্যাটা বোর হয়ে যায় না , একেই বলে ভালোবাসা । ছেলে খেলাধুলায় ভালো , খেলার মাঠে তার চিয়ার লিডার , থাক আর বলছি না নামটা । যেন এরা মেড ফর ইচ আদার । তবে , দিন এগিয়েছে , বন্ধুত্ব আরো ঘন হয়েছে , কিন্তু শুভ আজ অবধি বলতে পারেনি তার মনের কথা শুভশ্রী কে । কে জানে কোনোদিন পারবে কি না বলতে !!
সেদিন সোমবার , কলেজের কমন রুমে শুভ দেখি বসে আছে । দু তিন বার ডাকলাম , শুনতে পেল না । কাছে গিয়ে দেখি মুখ ভার । জিজ্ঞাসা করলাম , কি হয়েছে । বললো গতকাল ও আর শুভশ্রী , সিটি সেন্টার গেছিলো । ভাবলাম এ তো ভালো খবর । শুভ তখন ও বলে চলেছে ওরা কি কি করলো , কেমন এনজয় করলো । ওর মুখ থেকেই শুনলাম , শুভশ্রী ওকে একটা শেরওয়ানি গিফট করেছে । কৌতূহল বসত: প্রশ্ন করলাম , শেরওয়ানি কেন ? এবার বেশ কাঁদো কাঁদো মুখ করে শুভ র জবাব , আগামী মাসে শুভশ্রীর বিয়ে । আমাকে বিয়ে বাড়িতে থাকতেই হবে , তাই । 
ধূস ! এতো তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেলো । বলার সময়টাও পেলো না ও । কেঁদে আর কি লাভ । বললাম , ছেলে কী করে ? বললো ছেলের বহরমপুরে বিশাল ব্যবসা আছে । এদিকে শুভর চোখে জল , ওদিকে আমার মনে কৌতুহল , এতো হিট জুটি তাহলে শেষ ! এদিকে আমি ভেবে চলেছি , ওদিকে দুরে বিধাতা  আড়াল থেকে হেসে চলেছে ...
রাত অনেক হলো । আজ থাক , ঘুমিয়ে পরা যাক , কাল ,পরশু করে বাকিটা শোনাবো ।।

৩।।

নতুন ভোর হয়েছে । আমাদের জীবনে আর গল্পের প্রাণে । শুভ দেখলাম রেডি , বললাম কোথাও যাবি নাকি ? সে বেশ ইয়ার্কি মেরে বললো , চল না চড়ে আসি একটু । একদিকে আমার মাথায় তখনও সেই অতীতের ঘোর , টিকটিকিগিরিটা তখনও থামেনি আমার মাথায় ।
শুভ কিন্তু বেশ ফ্রেস মুডে , খালি গলায় গান ধরেছে , "ক্যাইসে মুঝে তুম মিল গ্যায়ী " । ভালো লাগছে ওকে এতটা খুশি দেখে । আমিও তৈরি হয়ে নিলাম ফটাফট । আমাদের সকলের গন্তব্য , মেট্রো সিনেমা । তারপর বিগবাজারে শপিং আর বিকেলে কালকের মতোই কে এফ সি র সাজানো বাগান ।।
শুভ কাম মে দের কৈশি । আমিও তৈরি হয়ে নিলাম । শুভর বাইক তখন দুরন্ত গতিতে ছুটছে । না ! অন্য রাস্তা মনে হচ্ছে । আরে , এ যে দক্ষিণেশ্বর । গাড়িটা হটাৎ রাস্তার ধারে থামিয়ে দিলো শুভ । বেশ ভারি গলায় , শুভ বলে উঠলো , এইখানেই প্রথম শুভশ্রী কে একটা প্রপোজাল দিই । ক্যান আই কিস ইউ ? উত্তর না । আর তারপর সেই মর্মান্তিক সংবাদ শোনালো আমাকে । " আই এম গেটিং ম্যারেড বাই নেক্সট মান্থ , ইউ হ্যাব টু লিভ উইথ ফ্যামিলি । ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড । " আর তার দিন তিনেক পরেই সেই ঘটনা । সুইসাইড । এই প্রথম দেখলাম শুভর গলাটা ভারি আর চোখে জল । কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না । শুধু ওর পিঠে হাত রাখলাম একবার ।।
সারা কলেজ জুড়ে শোরগোল । এম্বুলেন্স , পুলিশ ভোরে আছে কলেজ চত্বরে । রুটিন জানতে ফোন করেছিল শুভ । ওর আবার জ্বর , কলেজে আসতে পারেনি তাই । আমিও বললাম না তাই কিছুই । কিন্তু এ খবর কি আটকে থাকে , না রাখা যায় । দু দিন ধরে শুভশ্রীর কোন খবর পাইনি শুভ , ফোনটাও তুলছে না । জ্বর গায়ে একটা অস্বস্তি ভাব তাই । কিন্তু অন্যদিকে , তখন উৎকণ্ঠা , জীবন মৃত্যুর লড়াই লড়ছে শুভশ্রী । ডাক্তার ৭২ ঘন্টা টাইম দিয়েছে । কিছুই হতে পারে যে কোন মুহূর্তে । হাসপাতাল জুড়ে ভিড়ে ভিড় । ছাত্র , ছাত্রী , গার্জেন , টিচার পুলিশ সবাই অপেক্ষায় , কখন জেগে উঠবে শুভশ্রী । সবাই রয়েছে সেদিন , নেই শুধু শুভ আর দূরে বসে বসে আমার একটাই চিন্তা , কি করলো এটা শুভশ্রী , আর কেনই বা করলো ? কদিন পর বিয়ে আর...ছি: ছি:... এসব কেউ করে ! এক একবার মনে হচ্ছিলো শুভ এর জন্যে দায়ী নয়তো । আবার এই ভেবে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম যে ছেলেটা কদিন আগে স্কুল রিইইউনিয়ণ পার্টি তে  মদ্যপ অবস্থায় থাকা শর্মিলাকে সেবা করে যে ভাবে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলো , সে কিছু করেছে , মানতে পারলাম না ।।
দেখতে দেখতে তিন দিন কাটলো , হোস ফিরলো শুভশ্রীর । সবার মুখে একটা খুশির ভাব দেখা যাচ্ছিল যখন ডাক্তার বেরিয়ে এসে এই খবরটা দিলো । সবাই তখন শুভশ্রী কে একবার দেখা করার জন্য ব্যাকুল , এদিকে বাঁধ সাধলো ডাক্তার । ঘোষণা হলো , শুভশ্রী সবার আগে শুভর সাথে দেখা করতে চায় । 
পরিবারের মুখে একটা অবাক হয়ে চেয়ে থাকার ছাপ , কে এই শুভ ? শুভশ্রীর সাথে ওর কি সম্পর্ক ? আর বাকিদের মুখে একটাই প্রশ্ন , সত্যি তো শুভ কোথায় ? এদিকে আমি তখনও ভাবছি , শুভকে কি একটা খবর দেব । 
এরই মাঝে দূরে একটা চেনা মুখ দেখলাম বলে মনে হলো , একটা চেনা গলা খুঁজছে যেন শুভশ্রীকে । এতো আতঙ্কের মাঝেও সবার নজর তখন সেই মুখটাতে এসে আটকালো , আর আমি অবাক দেখলাম যে শুভ হাজির  । তবে, কে বলল ওকে শুভশ্রীর খবর ?

৪ ।।

সত্যি সত্যি ওটা শুভ ছিল । আস্তে আস্তে রুমে ঢুকলো সে । শুভশ্রী তখন চোখ বুঝে শুয়ে আছে । শুভর ছোয়ায় চোখ খুললো । চোখ দুটো জলে ভর্তি , ফোঁটা ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে । কাঁদতে কাঁদতে শুভর হাত দুটো চেপে ধরলো সে । অনবরত এক কথা , কেন তাকে বাঁচানো হলো , সে ওর কাছে যেতে চায় । শুভর মাথা যেন বন বন করে ঘুরছে । কি বলছে এ সব , কি হচ্ছে এ সব । রুম থেকে বেরিয়ে এলো শুভ । ওর মা কে ডেকে বললো একে বিষ দিতে বলুন আর ওর মৃত্যুর সমস্ত দায়িত্ব আমি নিলাম । সবাই অবাক , এসব আবার কি উল্টো পাল্টা বকছে ছেলেটি ।।
এদিকে তখন শুভশ্রীর মায়ের চোখেও জল । কিছুক্ষন এই ইমোশনাল সিন চললো । তারপর মায়ের মুখ থেকে যা শুনলাম , আমরা সবাই তো অবাক ! কি বলছেন উনি । শুভশ্রীর যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা , সে অলরেডি দেড , তাও চার বছর আগে ।।
দক্ষিনেস্বর ছেড়ে আমরা এখন কফি হাউসে । আড্ডা আর গান , পুরো মেজাজে চলছে । হটাৎ বেশ নস্টালজিক হয়ে শুভ আমাকে বলে উঠলো , জানিস সেই ছেলেটি , আরে বহরমপুরের যার সাথে পাগলির বিয়ে হতো , তার দাদার সাথে সেদিন কথা হচ্ছিল । শুভশ্রী নতুন বিয়ে করেছে , মুম্বাইতে আছে । শুনেও ভালো লাগলো , মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠেছে । তবে এর পুরো কৃত্বিত্ব একা শুভর । মেয়েটি যেদিন সুসাইড করে তার কয়েক দিন আগেই সে ছেলেটির মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে পারে । তারপর রাতে হোস্টেলের রুমে বসে লিকুইড মোরটিন খেয়ে নিয়েছিল । ছেলেটিকে খুব ভালোবাসতো নাকি শুভশ্রী । এ সবই সেদিন হাসপাতালে তার মায়ের মুখ থেকে শোনা ।।
এদিকে শুভকে এক কোনায় নিয়ে এসে আমি জানতে চাইলাম যে ওকে এ বিষয়ে কে বলল । জানলাম , ও শুভশ্রী কে ফোনে দুদিন না পেয়ে ওর বান্ধবি তৃষা আগারওয়াল কে ফোন করে । ওই বলে যে শুভশ্রী নে সুসাইড কিই হ্যায় । এই খবর পেয়ে আর থাকতে পারে নি শুভ । ভোরের ট্রেনে চলে আসে সোজা হাসপাতালে আর বাকিটা তো শুনলেনই আগে । তবে শুভর সেদিনের ঐ মৃত্যু দায়িত্ব তুলে নেওয়া আমার একদম ভালো লাগে নি । আর বাড়াবাড়ি যাতে না করতে পারে , তাই ওকে নিজে সোজা বাড়ি চলে এলাম ।।
এদিকে বাড়িতে আরেক কান্ড । এসব ঘটনা শুনে শুভর বাবা তো রেগে আগুন । বলেই বসলেন , এবার কিছু হলে ছেলেকে পুলিশে তুলবে , দেখো ছেলের কান্ড । শুভর মা কিন্তু কিচ্ছু বললো না । ছেলেকে কতটা ভালোবাসে তা আজ রাতের খাওয়ার টেবিলে বুঝে গেলাম । মাংস করেছেন , তবে ছেলে খাসি ভালো বাসে তাই তার জন্য আলাদা রান্না হয়েছে । আমার জন্য নিরামিষ কারণ আমি আবার ওসব খাই না আজকাল ।।
রাত কাটলেই চলে যেতে হবে । তাই ব্যাগ টা গুছিয়ে রাখলাম । রাতে জমিয়ে আড্ডা হলো আজ । নতুন পুরোনো কত কথা , আর এই প্রথম শুভর মুখ থেকে শুনলাম শুভশ্রী কিভাবে তাকে অপমান করেছে । খুব খারাপ লাগলো শুনে । সাথে মনে হলো মানুষ কিভাবে পাল্টে যায় । পয়সা সবাইকে পাল্টে দেয় । সত্যি বড়োই বিচিত্র এ নিয়ম !!

৫ ।।

রাত থেকেই জ্বর । কাল যে যাওয়া হচ্ছে না এটা তো সিওর । তবে রাত ভর এই পাগলামটা শুভ যে কি করে সহ্য করেছে তাই ভাবছি । অবশ্য এটাই প্রথম বার নয় । শুভশ্রীকেও ঠিক এই একই ভাবে সামলেছিলো শুভ । তাও দিনের পর দিন । ওর ক্রেডিট আছে বলতে হয় । এমনি অনেক কিছুই ভাবছি , এদিকে চায়ের কাপ হাতে হাজির শুভ । একদম নিজের স্টাইলে বলে উঠলো , টি ব্রেক ।।
চা খেতে খেতে অনেক ভাবনাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো । এবার আর পারলাম না চেপে 
রাখতে । জিজ্ঞাসা করেই বসলাম শুভকে , তুই কি সত্যি শুভশ্রী কে লাইক করতিস ? বেশ চাপা গলায় উত্তর এলো হুম । আমি বললাম , তবে এত দিন শুধু অভিনয় করে গেলি কেন ? ওর মায়ের কাছে একবার মন খুলে বলতেই পারতিস !
শুভর গলাটা বেশ নরম মনে হলো । শুভশ্রীর সঙ্গে হবু স্বামীর অভিনয়টা তার কাছেও বেশ কষ্টকর ছিল এটুকু তো বুঝি , বাট , কি করে পারলো সে এই অভিনয় করতে । শুভ বললো , সেদিন ওর মা আর ডাক্তার বাবুর রিকুয়েস্ট ফেলতে পারিনি । শুরু করি শুভশ্রীকে সুস্থ করার অভিনয় । ওর মন থেকে সুইসাইড এর ভূত নামানোর অভিনয় । ওর কত চাহিদা হাসিমুখে পূরণ করেছি কে জানে , শুধু শরীর বাদ দিয়ে ।
জ্বর গায়ে শুনছি আর কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে । দিনে কত বার ফোন করতাম ,হিসাব নেই । যা তা বলে যেতাম , আর এটা কাজও করছিলো । ডাক্তার বললো এতো কুইক রিকভারি কোনোদিন দেখেনি সে , কিন্তু আমি তো জানি , কিছুই উন্নতি হয় নি । নাহলে সেদিন , বিগবাজারে দাঁড়িয়ে শুভশ্রী আবার সুসাইড করবে বলে ! বেশ অবাক করা হলেও এটাই সত্যি ।
এর পর কলেজ শেষ হলো ওদের এক মর্মান্তিক ভাবেই । শুভ পাস করলেও শুভশ্রীর পাস করা আর হলো না । আর এর পর শুভশ্রী আর এগোতেও চাইলো না ।। শুভ বেশ হারে হারে টের পাচ্ছিলো যে কেসটা বেশ জন্ডিস । কোন রাস্তাও পাচ্ছিলো না । শুরু হলো কাকিমার কাছে আরেক অভিনয় যে শুভশ্রী সম্পূর্ণ সুস্থ । ওকে বিবিএ ও এম বি এ পড়তে সাউথে পাঠিয়ে দেওয়া হোক । এটাই যেন ওকে সুস্থ করার শেষ উপায় শুভ দেখতে পাচ্ছিলো আর শুভশ্রীকে বোঝানোর দায়িত্ব শুভ নিজে নিলো ।।
না , দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেছে । আজ মেনু মাছের মাথা , তবে ওই যে বলেছিলাম যে আমি নিরামিশি , তাই আমার জন্য স্পেশাল ধোঁকার ডালনা হয়েছে । খেয়ে উঠে আর শরীর চলছিল না । অতএব , ফেলু মিত্তির কে সরিয়ে রেখে এক ঘুম এই দুপুরে ।।

৬।।

রাত কেটে ভোর হল ।। সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে শুভর গাড়ির পিছনে সোজা ধর্মতলা ।। বাস ছাড়বে ঠিক ৮.২০ ।। বাসের টিকিট কেটে দিলো শুভ নিজে , আমাকে পেমেন্ট করতেও দিলো না ।। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল আজ ও স্বাধীন ।। কারণ আজ ও এ জঙ্গলে এক নতুন পরিবার গড়ার কথা ভাবছে , সঙ্গী হিসাবে পেয়েছে এক বাঘিনী কে , দি রয়েল বেঙ্গল টাইগ্রেস ।। ভয় পাবেন না , এ বাঘিনী শুভর জীবনে নতুন প্রেম , এসেও এখনও ধরা দেয় নি ।। 
অনেক কিছুই জানতাম না , আজ জেনে ফিরছি ।। সেদিন তার চিরদিনের ভালোবাসাকে বেঙ্গালুরুর মাটিতে এম বি এ করতে পাঠিয়ে দেয় শুভ নিজে ।। নিজে বসে থেকে শুভশ্রীকে রাজি করায় সে ।। বিমান বন্দরের সেদিন আর এক মাস আগেকার দিনটা মোটেও এক ছিল না ।। সেইদিন শুভশ্রী ছিল শুভর নয়নের মনি আর এই মাস খানেক আগে কলকাতায় যখন ফিরলো তখন তার হাতে অন্য একটি হাত ।। বিয়ে করেছে শুভশ্রী ।
শুভর কিন্তু আগে ভাগেই এয়ারপোর্টে হাজির হয় ।। তবে , তাকে দেখেও না দেখার ভান করে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় শুভশ্রী ।। আমি বসে আছি বাসে , কিন্তু মনে মনে অনুমান করতে পারছি কতটা কষ্ট পেয়েছিল শুভ ।। 
বিকেলে ফোন করলে শুভশ্রী তাকে চিনতে অস্বীকার করে এবং সতর্ক করে দেয় যে এর পর ফোন এলে বা ডিস্টার্ব করলে সে এফ আই আর করবে শুভর নামে ।। শুভ কিছু বলেনি সেদিন , কাউকে না ।। হয়তো আমাকেও বলতো না যদি কাল রাতে প্রচন্ড চাপ দিয়ে ঝগড়া না করতাম ।।
আই এম সরি , শুভ ।। ঝগড়া না করে উপায় ছিল না রে ।।
শুধু শুভশ্রীর শেষ কথাগুলো ... না , আজও ভোলেনি শুভ ।। 'সেবা করেছে বলে গায়ে পরার কি আছে , দাম টা নিয়ে নিলেই পারে '?

আমার বাস আসানসোল ঢুকছে ।। একটু পরে নেমে যাবো , রোজকার কাজে ভুলেই যাবো হয়তো এত ঘটনা , তাই লিখে ফেললাম ।। কিছু মনে করিস না ভাই ।। তোর মতন ভালো ছেলের জীবনে ভালোই হবে ।। যে খারাপ তাকে যেতে দে ।। দূর থেকে মনে মনে শুধু এটুকুই বলে যাচ্ছিলাম ।।
----------------------------××××------------------------------


(২)

 সোনার পাহাড় 

সিগারেটের শেষ কোয়ার্টার টান দিয়ে মাটিতে ফেলে নিভিয়ে দিলেন । এই গরমে বেশ অস্বস্তি লাগছে , তাই জেগেই রয়েছেন অনাদিবাবু ।। হটাৎ কেমন যেন একটা আওয়াজ পেলেন । কিছু ভাঙার শব্দ , জানলা মনে হল । প্রথমে চিন্তিত না হলেও , দ্বিতীয় দিন আবার মাঝরাতে ওই একই আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় তার ।। তাজ্জব ব্যাপার , পাড়ায় কোন চুরি বা ডাকাতি হয়েছে বলে শুনতে তো পাননি ।। তাহলে এ শব্দ কিসের ? আর আজ মনে হল একটা গাড়ি থামল , ভাঙা ভাঙ্গির পর স্টার্ট দিয়েই জোরে বেরিয়ে গেল । ছাদে দৌড়ে গেলেন অনাদিবাবু , তবে কিছুই দেখতে পেলেন না ।। এরপর নিয়ম করে দুদিন রাত জেগেছেন । না , কেউ আসে নি আর ।। তবে সন্দেহ যখন হয়েছে ছেড়ে দেওয়ার মত লোক নয় অনাদিবাবু ।। 
তিন দিন কেটে গেল ...
একদিন সামনের বাড়িতে কান্নার শব্দ । বাড়ি ভিড়ে ভিড়ে ।। বেরিয়ে জানতে পারলেন বাড়ির একমাত্র মেয়ে সুতপা কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ।। পুলিশে খবর দেওয়া হলেও , অনাদিবাবু তারই বাল্য সহচরী , মিস প্রিয়মবদাকে ফোন লাগলেন ।। আসলে প্রিয়মবদা হচ্ছেন একজন প্রাইভেট অনুসন্ধানী ।। অপরাধ অনুসন্ধান করে থাকেন ছোট খাট আর সেই সূত্রে পুলিশ মহলে বেশ পরিচয়ও আছে ।। পুরো নাম প্রিয়মবদা ধর ।। মহিলা হলেও ভয় ডর নেই ।। তিন বছর পাহাড়ে ছিলেন ।। তখন অশান্ত পরিস্থিতি ওখানে ।। 
খবর পেয়েই স্পটে সোজা হাজির হলেন মিস ধর ।। মুখে সিগারেট টানতে টানতে সোজা হাজির ভিড়ের মধ্যে আর মুহূর্তেই ভিড় ঠেলে সোজা ভিতরে ।। ভিতরে তখন পুলিশ আর হাজরা পরিবার । ধরকে দেখে একগাল হাসি মুখে এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর বিজয় চৌহান ।। পুরোন পরিচয় মনে হল ।। ইতিমধ্যে অনাদি বাবুও ঘরে হাজির ।। মিস ধর , আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন অনাদি বাবুই তাকে ডেকেছেন ফোন করে এই কেসের ব্যাপারে ।। চৌহান স্যারের মুখ দেখে মনে হল না তার কোন আপত্তি আছে ।।
ইতিমধ্যে খেয়াল করিনি প্রিয় মানে মিস ধর আরও দুটো সিগারেট শেষ করে ফেলেছে আর শেষ কাউন্টার অনাদিবাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে পরিবারের সামনে হাজির ।।
~ কি করে হল ব্যাপারটা ?
হাজরা পরিবারে তিনটি মানুষ ,  বাবা, মা ও মেয়ে ।। বেশ কিছুদিন ধরেই কলেজ থেকে ফেরার পথে আরিফ ও তার দল বল রাস্তায় ধরে যা তা বলত ।। আরিফ স্থানীয় পার্টির ছেলে , তাই কারুর কিছু বলার জো নেই । দুদিন আগে আরিফের বন্ধু আসিফ সুতোপাকে রাস্তায় ধরে প্রপোজ করে । নিকা করার হুমকি দেয় ।। কোনরকমে পালিয়ে আসে সেদিন সুতপা ।। ও বলেছিল , ফল ভাল হবে না ।। নিখোঁজের দিন কলেজে বেরোয় মেয়েটি দুপুর বারোটায় । রোজ বিকেল পাঁচটার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসত । সেদিন আসেনি দেখে সন্দেহ হয় । খোঁজ শুরু হয় কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায় নি । তখন পুলিশে খবর দেওয়া হয় ।। 
~আপনি কি করেন ? মিস্টার হাজরাকে প্রশ্ন ধরের ।। 
~আমি একটা দোকান চালাই । ওই মিষ্টির দোকান ।। 
~বাড়িতে তিনজন ছাড়া আর কেউ ?
~না , আর কেউ নেই । তবে সকালে কাজের মাসি আসে ।। 
ওরা বলে চলেছে আর অনাদি বাবু ডায়েরিতে নোট করে চলেছে ।।
~ কোন ফোন এসেছিল ? মানে টাকা পয়সা চেয়ে ...
~ আজ্ঞে , না তো ।।
~ মেয়ের কোন ছেলের সাথে চক্কর ছিল না তো ? পালিয়েছে দেখুন ।।
~ মেয়ে আমার খুব ভদ্র । ওসব কিছু ছিল না ।।
এবার বেশ ব্যঙ্গ স্বরে ইন্সপেক্টর চৌহান বলে উঠলেন , ভদ্র !! তাহলে গেল কোথায় ? 
মিস প্রিয় সিগারেটে টান দিতে দিতে ইন্সপেক্টর কে বেশ ধমকিয়ে বলে উঠল , সেজন্য আমরা আছি ।। 
এটুকু বলে অনাদিবাবুকে সঙ্গে নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মিস ধর ।। 

রাত কেটে সকাল হল...
একটা গরম চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে প্রিয় বলতে শুরু করল । অনির সাথে দেখা প্রায় বছর তিনেক পর । বেশ পাল্টে গেছিস তুই অনি , প্রিয় বলে চললো , সেই কলেজের বোকা ছেলেটা আজ আমার পাশে বসে কেস সলভ করছে ।। কত পুরনো কথা যে সেদিন চায়ের ঠেকে আদান প্রদান হল খেয়াল করে নি দুজনেই ।। চা খেয়ে , সিগারেটের ধোয়া হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে উঠে পড়ল প্রিয় ।। চল , কলেজটা একবার ঘুরে আসা যাক ।। অনাদিবাবু , গাড়ি বার করবে বলায় বেশ রেগে গিয়ে প্রিয়র জবাব , চল না হেঁটেই যাব ।। ভালোবাসার দিনটা একবার ফিরিয়ে আনাই যাক ।। বেশি দূর তো নয় মদনপুর কলেজ অফ আর্টস ।। হেটে আধ ঘন্টা লাগবে , আর এখনও অনেক সময় বাকি ।। হাতে হাত ধরে ঠিক চলে যাবো ।। তখন তো ঠোটে ঠোট রাখতিস , আর এই কদিনে হাতে হাত টাও রাখতে পারছিস না ।।

ভাগ -২ 

থানার ভিতর ...
ইন্সপেক্টর চৌহান বসে আছেন ।। বাইরে একটা গাড়ি এসে দাড়ালো ।। লাল রঙের স্কর্পিও ।। গাড়িটি থামতেই সবাই উঠে দাঁড়াল , কোন বড় হস্তি মনে হয় ।। গাড়ি থেকে নামলেন , একজোড়া বুট আর কালো কোট গায়ে একজন উকিল ।। প্রিয় ও অনাদিবাবু ভিতরেই ছিল তখন ।। 
কেমন চেনা লাগছে না গাড়িটা ? প্রিয়মবদার মুখে একটা প্রশ্নের ভাঁজ ।। ওর আবার এসব মুখস্থ , মানে বড় বড় সেলিব্রিটিদের গাড়ির নাম , নম্বর ইত্যাদি ।। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো ; ম্যাডাম আসেননি ।। 
~ ভিতরে ...
ততক্ষনে অনাদিবাবুও  বুঝে গেছেন , এ তো মন্ত্রীসাহেবার গাড়ি ।। ওদের ছেলেকে পুলিশ এরেস্ট করেছে বলেই কি এই আগমন !! মন দিয়ে কথপকথন শোনার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি ।।
~ আরিফ ও আসিফ কে কোন সাহসে এরেস্ট করলেন ? উকিলবাবুর প্রশ্ন ।।
~ পুলিশের মনে হয়েছে তাই ধরেছে ।। বেশ জোর গলায় বলে উঠল প্রিয় ।।
এবার একটু বাঁধা দিয়েই উকিল বাবুর প্রত্যুত্তর ; " জানেন না , ওরা আমাদের ছেলে "।।
~ বউয়ের গর্ভের না কি ইললেজিটিমেট ? প্রিয় বলে উঠল ।।
এবার একপ্রকার রেগে গিয়ে সজোরে এক থাপ্পড় কষে দিলেন উকিল বাবু ।। 
~" বেল টা করুন "... উকিল বাবু বলে উঠলেন ।।
 মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছিস শালা , প্রিয় চেঁচিয়ে উঠল , এরেস্ট করুন একে এক্ষুনি ।। 
পরিস্থিতি বেশ গরম দেখে অনাদিবাবু , মিস প্রিয়মবদকে ওখান থেকে টেনে সরিয়ে বাইরে নিয়ে এল আর একটা ট্যাক্সি ডেকে জোর করে তুলে নিয়ে চলে গেল । যদিও কাজটা এত সহজ ছিল না , তবু তিনি সেটা বেশ সফল ভাবেই করলেন ।।
ঘন্টা খানেক পর ট্যাক্সি থামল একটা চায়ের দোকানে ।। মিস প্রিয় তখনও রাগে ফুসছেন ।। কিছু না বলে আগে দুটো চা ও একটা সিগারেট এর অর্ডার দিলেন অনাদিবাবু ।। 
~ মাথা ঠান্ডা কর প্রিয় , অনাদিবাবু বললেন ।।
~ চুপ করে থাক , নপুংসক , প্রিয় বলে চললো , তোদের মত লোক থাকলে দেশে অপরাধ আরও বাড়বে ।। শালা , দুটো ক্রিমিনালকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল , কিনা ম্যাডামের কাছের লোক ওরা ।। থু...
একটা সিগারেট মুখে ধরিয়ে , প্রিয় বলল , ভয় পাস ? 
~ না , আস্তে করে অনাদিবাবু বলে উঠলেন , তবে তোর জন্য ভয় হয় ।। তোর যদি কিছু হয়ে যায় ...
~ ধুর পাগলা , কিসসু হবে না ।। আমায় ছুঁয়ে দেখাক , শালাদের খালাস করে দেব না ।। আর শোন আমাকে ভালোবাসিস তো , জানি ওগুলো ভালোবাসায় হয় ।। কিন্তু বস , আমি এই প্রজাতির ।। তাই কেয়ার দেখালে আসতে পারেন আপনি ।।
~ না , না ।। তা নয় ।। কাছে টেনে নিয়ে , চল কোথায় যাবি চল ।।
প্রিয় এবার একটু শান্ত হয়ে বলে উঠল , তোদের পাড়ার পিছনেই ওদের পার্টি অফিস না ?
~ হ্যা .. কিন্তু আজ তো বন্ধ আছে ।।
~ তাতে কি বস , ওদিকে যেতে মানা নাকি ? 
~ বেশ চল ।। 
যদিও এই ঝামেলার পর , ওদিকে যেতে চাইছিল না অনাদিবাবু , তবু প্রিয়মবদাকে এই মুহূর্তে না করার ক্ষমতা তার ছিল না , আর না করলেও প্রিয় শোনার মেয়ে নয় ।। সুতরাং , হাঁটা লাগালো ওরা , তবে ঘুরপথে ।।
বাড়ি ফিরতে আজ বেশ রাত হবে মনে হচ্ছে অনাদিবাবুর ।। প্রিয় কিন্তু নানা পুরোন গল্প জুড়ে দিয়েছে , ওদের ভালোবাসার ।। এ রাস্তা , সে রাস্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে ।। কিন্তু ঘুরে ফিরে একটা জায়গায় ফিরে ফিরে আসছে ।। যেন একটা চক্রের মধ্যেই ঘুরছে ওরা দুজনে ।। মনে হচ্ছে , কিছু মাপতে চাইছে প্রিয় কিন্তু পারছে না ।। আবার হয়ত প্রিয়মবদা কারুর অপেক্ষা করছে ।। সিগারেটের ধোয়া , ভালোবাসার গল্প সব মিলিয়ে অনাদিবাবুর মনে হচ্ছে এ রাত তোমার আমার ।। কিন্তু এই তুমি টা কে জানে না দুজনেই ।। 
হটাৎ প্রিয়র নির্দেশ , ঝুকে যা অনি ।। কোন রকমে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল ওরা ।। সেই লাল স্কর্পিও ... জোরে বেরিয়ে গেল ওখান দিয়ে ।। মিস প্রিয়মবদার মুখে একটা বড় হাঁসি ।। সমানে বলে চলছে , ইউরেকা ইউরেকা পাগলের মত ।। অনাদিবাবু বুঝতেই পারছেন না , কি খুঁজে পেল প্রিয় এবার ।। দুদিন কেটে গেলেও হাজরা পরিবারের মেয়ের যখন কোন খবর পুলিশ জোগাড় করতে পারে নি , তখন এই যুবতী কি এমন পেয়ে গেল , অনাদিবাবু ভেবে চললেন ।। আর বিশেষ কোথাও গেল না ।। অনাদিবাবুর বাড়িতে বসে দু কাপ কফি , কিছু সিগারেট , তারপর বাড়ি ।। যাওয়ার আগে বলে গেল শুধু , ওর ঘরটা খুব গরম , তাই ছাদে ঘুমানটাই শ্রেয় ।।

ভাগ - ৩

ধুর ছাই .... অনাদিবাবু একবার এপাস একবার ওপাশ করে চলেছে বিছানার ওপর ।। প্রিয় যে হটাৎ কেন ছাদে ঘুমাতে বললো কে জানে !! কোন ব্যাপার আছে না কি জাস্ট এমনি কিছুই বুঝে উঠে পারছেন না তিনি ।। এরই মধ্যেই হটাৎ সেই শব্দ , কিছু ভাঙছে কেউ ।। দৌড়ালেন তিনি ছাদের দিকে ।। 
যতক্ষনে পৌঁছালেন ছাদে , ততক্ষনে একটি গুলির শব্দ , আরো দুটি ।। ছাদে গিয়ে দেখেন রাস্তায় পুলিশের ছয়লাপ ।। ভিড়ে ভিড় ।। নীচে এলেন দৌড়ে ।। এ সব কি হচ্ছে পাড়ায় .... চিৎকার করে উঠলেন তিনি ।।
ততক্ষনে পথ আটকেছেন ইন্সপেক্টর চৌহান ।
~ ওদিকে যাবেন না ।। প্রাণ সংকট হতে পারে ।।
এদিকে প্রিয়র ফোন লাগছে না ।। সুইচ অফ বলছে ।। অনাদিবাবুর মনে কেমন একটা অস্থির ভাব ।। 
~ জানেন কিছু দিন আগেও এই ভাঙা ভাঙ্গির শব্দ পেয়েছিলাম ।। পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললেন অনাদিবাবু ।। 
এক লেডি ইন্সপেক্টর দূর থেকে বলে উঠল , সব জানি আমরা ।। তুমি পিছনের পাড়ায় যাও একবার ।। এই শুনেই অনাদিবাবু দৌড়ালেন পিছনের গলির দিকে ।। ওদিকটায় বেশ খালি ।।পার্টি অফিসের গা ঘেষে চলে গেছে একটা সরু গলি , তার ফাঁক দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বাড়িটি ।। হটাৎ ছাদের ওপর থেকে কেউ একটা কিছু ছুড়ল তার দিকে ।।
কোন রকমে সরে গেলেন অনাদিবাবু ।। অন্ধকারের জন্য তাকে কেউ দেখতে পাই নি ।। আস্তে আস্তে আবার এগোচ্ছেন তিনি ।। প্রায় বাড়িটার পিছনে হাজির ।। সেখানে জানলার দুটি রড ব্যাকানো ।। তার ফাঁক দিয়ে তিনি হাজির হলেন ভিতরে ।। বেশ অন্ধকার ঘর ।। খুঁজে খুঁজে পকেটের দেশলাই জ্বালালেন অনাদিবাবু ।। গুলির শব্দ প্রায় থেমে এসেছে দেখে দরজা খুলে দিলেন ভিতর থেকে ।। 
অবাক কান্ড ।। লড়াই তো চলছিল বেশ খানিকটা দূরে ।। আর এর সামনের বাড়িটি তো তার চেনা মনে হচ্ছে ।। হটাৎ কে পিছন থেকে এসে তার মাথায় থাপ্পড় মেরে বলে উঠল ,আরে পাগল , এটা চিনিস না তোর নিজের বাড়ি ।। আর এটা হাজরার বাড়ি ।। 
অনাদিবাবু মাথা চুলকাচ্ছেন ... প্রিয় তুই কোথা থেকে ....
প্রিয় বলে উঠল , ওরে সব বলছি আগে সিগারেট দে ।। এদিকে ইন্সপেক্টর পাঁচটা আসামিকে বেঁধে এনেছে ।। আসিফ , আরিফ , মি. হাজরা , মিস.ঘোষাল বা মিসেস হাজরা ও একজন নতুন , নাম , পাণ্ডু ।। 
~ দেখবেন , যেন ঠিক করে বেঁধে রাখা হয় ।। প্রিয় বলে উঠল ।। 
অনাদিবাবু তখনও ভাবছেন আর এরই মধ্যে সুতপা হাজির ।। প্রিয় ওকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলল , বল তো বাবু স্টোরি টা কি ।।
বাচ্চা টি কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল , ওরা যুবতী মেয়েদের ধরে পাচার করে দিত ।। এরা আমার আসল বাবা মা নয় ।। আমি অনাথ ।। আমাকে সেদিন রাতে জোর করে তুলে ওই ঘরে বন্দি করে রেখেছিল , তবে দরজা দিয়ে নয় , পিছনের জানালা দিয়ে বের করে পার্টি অফিসের ও পাশের গলি দিয়ে তুলে নিয়ে যায় ।। তারপর একটা আলমনিয়ামের বাক্সে ভরে দেয় ।। শুধু স্বাস্ নেওয়ার দুটো ছিদ্র ছিল ।। সেদিন রাতে কাকু ছাদে চলে আসে তাই নিয়ে যেতে পারে নি ।। পরদিন আমার হারিয়ে যাওয়ার নাটক করা হয় , যাতে কেউ সন্দেহ না করে ।। তবে সেই রাতে আরিফ ও আসিফ ওই ঘরে ঢোকে ও বাক্স খুলে আমার শরীর টাকে টেস্ট করতে থাকে ।। 
~ মানে এককথায় ধর্ষণ করা হয় , প্রিয় বলে উঠল ।। তারপর বাচ্চা টিকে চলে যেতে বলে পুলিশের সাথে ।।
~ আচ্চা , এই জন্য কাঁচ ভাঙার শব্দ হত ; ওটা আসলে এলুমিনিয়ামের বাক্সের শব্দ !! ও তো আমি আগেও শুনেছি ।।
~ সেদিন যে গলিতে আমরা লুকিয়েছিলাম সেটি ছিল , হাজরা পরিবারের বাড়ির পিছন দিক ।। আমার চোখে পড়ে ভাঙা রড ওয়ালা জানলা ।। ঠিক যেমনটা দেখে ছিলাম হাজরাদের বাড়িতে ।। আর ওপাশের গলি দিয়ে গাড়িটি বেরিয়েছিল ।। লক্ষ্য করি ওই গাড়িতে দুজন জেল ছাড়া পাওয়া মহারতি বসে আছে ।। ওপাশের বাড়িটি হল ওই বন্ধ বাড়িটির পিছন দিক সেটা হিসাব করে দেখি ।। কলেজে জানতে পারি সুতপা নামে কেউ পড়ে না ।। আমি হাজরা পরিবার কে এরেস্ট করাতে পারতাম মিথ্যে বলার জন্য কিন্তু পুরো দল ধরা পড়ত না আর এত মেয়েও উদ্ধার হত না ।। ভাবতে পারছিস ৩৫ টি যুবতী ।। সবাই অনাথ ।। 
কাল ওই ঘটনা ঘটে গেছে বলেই ওরা আজ কিছু করতে পারে বলে আন্দাজ করেছিলাম ।। তাই পুলিশ নিয়ে হাজির ছিলাম ।। বাকিটা দেখলি তো ....
অনাদিবাবুর চোখ পড়ল কাঁধের দিকে , রক্তের দাগ ।। 
~ ও কিছু নয় , একটা বুলেট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে ।। সিগারেটের ধোয়াঁর মত উড়ে যাবে ।। 
হাসপাতালে তো নিয়ে যাওয়া হল কিন্তু অনাদি ভাবছেন , সিগারেট আর বুলেট কি এক হল !!

সমাপ্ত :---

লেখিকা - শ্রীমতী অঞ্জলি দেনন্দী এর গল্প

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আমি এবছর ( ২০১৬ খ্রীষ্টাব্দ ) , দূর্গা পূজর সময় দক্ষিণ ভারত , ভ্রমণ করতে গিয়েছিলুম ; সাথে আমার পতিদেব ও ছিলো ; আমরা নতুন দিল্লী থেকে এরোপ্লেনে চড়ে , চেন্নাই গেলুম , প্রথমে ; সেখানে , আমার সুপুত্রের দৌলতে , সি.এম. আই . -  এর গেস্ট হাউস - এ রইলুম ; আমার ছেলে তো ওখানেই পড়ে , তাই , সুবিধা পেলুম ; তারপর . সেখান থেকে , পুরুচেরী গেলুম ; মা আনন্দময়ীর জন্য বিখ্যাত , মাত্রী মন্দির , দেখলুম ; জঙ্গল ঘেরা পথে , রোদে , হাঁ ঠতে - হাঁ ঠতে চললুম , ........ বেশ অনেকটা পথ ! ফোটো ও তুললুম ; পথে যেতে-যেতে , একটি বট গাছ দেখলুম , ওপর থেকে মোটা-মোটা ঝুড়িগুলি নেমে এসে মাটী ভিতরে ঢুকে গেছে ; মনে হচ্ছে যেনো , নীচে থেকেই ওগুলি ওপরে গিয়েছে ; আমি বোটানি পড়েছিলুম , বি.এস্সিতে তাই , ঠিক কী , বুঝলুম ; এবার আমরা , একটি সী-বিচে গেলুম , এটি খুব সুন্দর ! এখানে  খুব হাওয়া ! এটি ওপেন-সী-বিচ ; এখানে স্নান করার জন্য অতি উত্তম ! ফোটো তুললুম ;  এবার আমরা , আমাদের বুক করা কারটি চড়ে গেলুম , ক্লোজ সী-বিচ দেখতে  ; ফোটো ও তুললুম ; তারপর গেলুম ঋষি অরবিন্দের আশ্রম ; বই কিনলুম , সেখান  থেকে ;  ফিরে এসে , একটি হোটেলে থাকলুম , রাতটুকু ; তারপর , চোললুম , মা মীনাক্ষী মন্দিরের উদ্দেশে ; সেখানে আরতী দেখলুম ; তারপর , একটি হোটেলে থাকলুম ; পরের দিন , চোললুম , কান্য়াকুমারীর পথে ; গিয়ে বিরাট লাইন দিয়ে , স্টীমারে ভেসে গেলুম , বিবেকানন্দ রক টেম্পল-এ ; কী সুন্দর-পবিত্র হাওয়া ! ওঁ - এর , ধ্যান করলুম , চোখ বন্ধ করে , এক ঘন্টা , প্রায় ; এরপর কেনাকাটা করলুম ; ফোটো ও তুললুম ;.........কী মনোরম মহাসাগরের লহরী........দূরে মহান তামিল কবির মূরতীও দেখা যাচ্ছে ; ফিরে এসে , স্নান করলুম , নীল মহাসাগরের জলে ; তারপর যখন রাস্তায় চোলছি , দেখি যে , পথে , শোভাযাত্রা চোলছে.......সেদিনটি ছিলো বিজয়া দশমী ; ভি. ডি. ও কোরলুম ; রং-বেরঙ্গের ছাতা মাথায় রমনীগন চলেছেন..............এরপর এক ভাণ্ডারায় প্রসাদ খেলুম ; ভাত, তরকারী, ডাল, চাটনী , আরও......এবার ফিরে এলুম হোটেলে ; তারপরের দিন গেলুম রামেস্বর ; নন্দীদেবকে  দেখলুম ;  মন্দিরে বাবা শিবের আরতী দেখলুম ;  সাগরের জল ও দেখলুম ; কেনাকাটা করলুম ; শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন দেখলুম ; ফোটো তুললুম ; ডাবের জল পান করলুম ; এবার , ট্রেনে করে ফের চেন্নাই ফিরে এলুম ; পুত্রের গেস্ট হাউস -এ রইলুম ; তারপরদিন , এরোপ্লেনে করে দিল্লী এয়ারপোর্ট এলুম ; তারপর কারে করে বাড়ি ;সেখানেই তো আমরা বাস করি |
লেখিকা - শ্রীমতী অঞ্জলি দেনন্দী , মম


মোস্তাফিজ ফরায়েজীর গল্প অনুর বিয়ে


.















মোস্তাফিজ ফরায়েজীর গল্প
অনুর বিয়ে

অনুর বিয়ে হয়েছিল।
তার উপর আবার অনুর নাম্বারটা এক সপ্তাহজুড়ে বন্ধ।
বিয়ে তো অনুর হবেই। বয়সটাও কী তার কম! এ বছর তেইশ বছরে পড়েছে। আর দু'একবছর হলেতো অনু বুড়িই হয়ে যেত। তবুও আমি তার বড়বোন তনুকে মুঠোফোনে প্রশ্ন করলাম, অনুর কী বিয়ে?
কী হতচ্ছাড়া মার্কাই না প্রশ্নটা। সব জেনে শুনেও এরকম প্রশ্ন কী কেউ করে? আবার তনু আপুর উত্তরটাও কেমন বিদঘুটে, তুমি জানলে কীভাবে?
ভাবখানা এমন যেন আমি জানলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।
তা তো হবারই কথা। আমি হলাম অনুর বয়ফ্রেন্ড। প্রশ্নটা এখন, তাহলে অনুর কার সাথে বিয়ে হয়েছিল? হ্যা, দুবছর আগে, তার কম হবে না।
কার সাথে আবার! আমার সাথেই। কীভাবে? অতি গোপনে, চুরি করে।
আসল ব্যাপারটা হলো, তনু আপু যে বলল, অনুর বিয়ে! এখন কী হবে?
সেই শোকে এক গাছি দড়ি এনে গলায় ফাস দেব? না, অনুর বিয়ে বলেই কী দড়িতে ঝুলতে হবে আমাকে? আমি মরলে আমার বাবা যদি স্ট্রোক করে? বাবার শোকে আমার শোকে মা যদি বিশ খায়? তখন কী হবে? তাই ভাবছি, এখন কী হবে?
অনুকে কী আমি এত সহজেই ছেড়ে দেব?
আমার আর ওর বিয়ে তো আর সবার মত বিয়ে নয়। সাত বছর প্রেমের পরে দুবছরের বিয়ে। সাত বছরের প্রেম কী চাট্টিখানি কথা? কত স্মৃতি! কত কথা! কত সুখ! কত রাগ! তার কী আর হিশেব আছে! তাই ঠিক করলাম ওকে যদি ছাড়ি ছাড়ার মতই ছাড়ব।
অনুর বিয়েটা আবার দুদিন বাদেই। বুধবার, বৃহস্পতিবার তারপর বিয়েবার।
অনুর বিয়ের দাওয়াত দিতে নয়, বরং নিজের এই ঘোর বিপদের দিনে বন্ধু বান্ধবদের কাছে ডাকলাম শলা পরামর্শের জন্যে। তাদের আবার নানান কথা।
কেউ বলে, এই বয়সে এত ঝুট ঝামেলায় জড়াস না। যে যাবে সে চলে যাক। এ বয়সের ঝড়ে অনেকের জীবন বিপন্ন হয়।
কেউ বলে, বিয়ে কী যা তা জিনিস? তুলে নিয়ে আয় ওকে, দেখি কে ঠেকায়?
তাইতো! কথা কিন্তু মন্দ নয়, কত মেয়েকে কত ছেলে বের করে এনে দিব্যি সংসার করে চলেছে। আমিও না হয় ওদের দলের একজন হয়ে গেলাম। এতে কী এমন ক্ষতি!
তাই সেদিন রাতে তনু আপুকে আবার ফোন দিলাম, বললাম, ‘অনু- বিবাহিতা!’
‘কী যা তা কথা! বড় আপু হয়েও জানি না। তোমারই বা কেন এত মাথা ব্যাথা?’
‘কাবিনটা পাঠিয়েছি, একদম খাসা।’
তনু আপুর ওপাশের ঢোক গেলার শব্দ এপাশেও শুনতে পেলাম।
তারপর অনুর সাথে কথা। অনুতো ফোনই ধরবে না। শেষমেশ ফোনটা ধরে বলে কী জানেন?

কেএএ? কেএ আপনি?
কোন রিংকু?
চিনতে পারছি নাতো!
আপনি এখানে ফোন দিয়েছেন কেনো?
আশা করি আর ফোন করবেন না।

কী হল? যে অনু আমাকে ছাড়া এক মূহুর্ত থাকতে পারত না, সে একি বলল! অনুই কথা বলল তো! নাকি অন্য কেউ।
নাহ, অন্য কেউ তো হতেই পারে না। নয় বছরের অতি আপন কণ্ঠস্বর, চিনতে ভুল হওয়া অসম্ভব প্রায়। এই নয় বছররে মাঝে বিশ্বাসঘাতকতা বলতে প্রেমের পঞ্চম বছরে। ও তখন রাজশাহী, আমি ঢাকাতে। ওকে পাবার জন্য কিই না করেছি আমি। গাধার মত খেটে টিউশনি করিয়ে টাকা জমিয়ে জমিয়ে ওর জন্য তেল-নুন থেকে শুরু করে নোকিয়া মডেলের নতুন মোবাইলফোন পর্যন্ত কিনে দিয়েছিলাম সেবছর।
আর ওই বছরেই ওর গড়িমসি, পড়ার বড্ড চাপ, রাত ১১টার পরে আর কথা নয় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। ওকে বড্ড বিশ্বাস করেছিলাম। তাই তখনকার দিনে একটার বদলে এগারোটায় রাত শেষ হত আমার। অথচ একদিন সোয়া বারোটায় ফোন দিতেই বিপত্তি। অপর প্রান্তে অনুর হাতের নতুন নোকিয়া ফোনটি তখন ওয়েটিং-এ, সেই সোয়া বারোটা থেকে পৌনে তিনটা। ওয়েটিং আর ওয়েটিং। তখনও আমি ভেবেছিলাম, এখন কী হবে?
আমি কী ওকে ছেড়ে দেব? নাহ, সেসময়ও ওকে ছেড়ে দেওয়াটা আমার হয়ে ওঠে নি। ছেড়ে দেওয়া জিনিসটা অত সহজ নয়।
ওই বরং ওর দ্বিতীয় প্রেমিককে ছেড়েছিল। ওর কাছে হয়তো ব্যাপারটা সহজ ছিল। হয়তো সহজ বলেই ও আজ আমাকে বলতে পেরেছে, কোন রিংকু? আজ যেন সব কিছু বৃষ্টির পানির মত পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেসময়। অতি স্বাভাবিক, তাই না? প্রেম তো! ঝড় তো থাকবেই। যাই হোক সেসব ঝড়-ঝাপটার দিন পার করে দু'বছর আগে একদিন হঠাত আমি ফোন করে অনুকে বলেছিলাম, ‘বড্ড তাড়না, বড্ড কামনা। আমায় তুমি রক্ষা করো। আমায় তুমি বিয়ে করো।’
অনু বলেছিলো, ‘তোমার মত পুড়ে পুড়ে আমিও মরছি। আমি ঢাকায় আসছি।’
এরপর অনু ঢাকায় এসেছিল। আমরা ফার্মগেটে কাজী অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর একসাথে একঘরে রাতের পর রাত কাটিয়েছি। অতি নিরবে, অতি নিশ্চুপে। কেউ শুনতে পায় নি সেসব রাতের ফোঁসফাঁস শব্দ। অথচ গত দুটি বছর বছির আংকেলের ফ্লাটে কত রাত সাপের ন্যায় দুজন শুয়েছি তা তো অনু ছাড়া আর কারো জানারও কথা নয়। সেই অনু- আমার অর্ধাঙ্গী, মাত্র সপ্তাহখানেকে আমায় ভুলতে বসেছে। এ যেন এক অবাক বিস্ময়!
নারী তো!
সেদিন রাতেই রওনা দিলাম। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল সাতটা। আটটায় রশীদমামাকে ঘরে এনে দরজার খিড়কি এটে দিলাম।
মামা অভিজ্ঞ মানুষ। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। এলাকাতেও ভালো দাপট। আমার সাথে মামার বেজায় ভাব। মামাকে সব খুলে বলতেই মামার উক্তি, ‘যদি সে না চায়, তবে কীভাবে হবে? যদি সে চায়, তবে ঠেকাবে কে?’
সে। নারী। কোমল মনের অধিকারিণী। সব প্রেমের সঞ্জীবনী। সে। সম্পর্কের সুতো। সে যদি ছিঁড়ে যায় তবে এ আমি একাকার।
তাই মামাকে বললাম, ‘তার সাথে কথা বলার উপায় নেই। ফোন বন্ধ।’
মামা বলে, ‘তবে যাই বিকালে। অনুর ভাষ্য শুনে আসি।’
যেতে তো আর ঘন্টা পাঁচেক লাগবে না। অনুর বাড়ি আর আমার বাড়ির দূরত্বই বা কতটুকু। সাত মিনিটের পথ। একি গ্রামে বসবাস।
বিকেলটা যেন আর আসে না। মামা আর দু’তিনজন মিলে বিকালেই অনুর বাড়ির পথে যাত্রা করল। ফিরে আসতেও দেরি হল না।
মদ খাই। গাঁজা খাই। হিরো খাই। নেশা করি। এই আমি। বখাটে, ইভটিজার, উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে।
এই ছিল অনুর কাছে আমার বর্তমান পদবী।
সপ্তাহখানেক আগেও ওর কাছে আমার পদবী ছিল- প্রতি মূহুর্তের নিশ্বাস, প্রতি দিনের দীর্ঘশ্বাস।
মামা বলল, ‘ছাড়, ডাইনিটাকে।’ এছাড়া নানা উপদেশ, সান্ত¡না।
তবু।
এসব পদবী পেয়েও থেমে থাকাটা হল না। ছেড়ে দেওয়াটা হল না।
অনুর কাছের এক বান্ধবী নিলা গোধূলি বেলায় আমার হাতে একটা চিরকুট গুঁজে দিল।
সেই চিরকুটের উপরেই রাতে পড়লাম। কয়েকটি সংখ্যা দেওয়া ছিল চিরকুটে। ফোনে ডায়াল করতেই অনুর ভাবী দ্বিতীয় বরের কন্ঠস্বর। মোটা, ঢেমশাটে। বয়স্ক লোক বটে। শুনেছি গাঁটে টাকা আছে। এই টাকাওয়ালা ঢেমশাটে লোকটা সব শুনে যা বলল তাতে তো চক্ষু ছানাবড়া হবার বদলে মন মনমরা হয়ে গেল। ঢেমশাটে লোকটার যে কোনকিছুতে অরুচি নেই বুঝলাম। তার একজন হলেই হল, অনু হলে তো কথাই নেই। রূপে রূপবতী, হাসিতে মায়াবতী, শরীরে জোশ। তার এই বয়সে আর কী চাই? অনু একটা না দশটা বিয়ে করেছে একথা তার কানে গেলে ক্ষতি কী? সেও তো আগে দুইটা করেছে।
অরুচি তো অনুরও নেই। তা না হলে...। ভাবা যায় না।
নারী তো!
পরিবার আর টাকা, এইতো সব। আর কী চাই? প্রেম তো নারীর চারপাশে ঘুরঘুর করে মৌমাছির মত। চাইলেও, না চাইলেও। সেখান থেকে এক খামচা প্রেম যখন তখন নিয়ে নিলেই প্রেমের চাহিদাও মিটে যাবে অনুর। আমার ভালোবাসারই বা তার দরকার কীসের?
ওর বিয়েবার আর আমার শোকবার পার করে আবার ঢাকার পথে। সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা, হাতে ডিভোর্স লেটার। এই অকালে অনেকের অগোচরে যে ঝড়টি বয়ে গেল তা বোধহয় সুনামির চেয়েও কম নয়।
কোমল হৃদয় আমার। কোনদিন মুখ দিয়ে ধুয়াও ফুঁকি নি। সেই আমি আজ নিজেকে বড্ড কলঙ্কিত বোধ করতে লাগলাম। পুরুষের কলঙ্ক, বড্ড কঠিন জিনিস।
যাত্রাপথে ট্রেনের হুইছেলের সাথে সাথে স্মার্টফোনের টাচ স্ক্রিনে ভেসে আসতে লাগল নানান ছবি। নানান ছবি মানে নানান স্মৃতি, নানান ঘর, নানান ভালোবাসা, বছির আংকেলের ফ্লাট। ছবিগুলো একটি মৃত পাখির আর একটি উড়ন্ত চিলের।
আমার আবার ফেসবুক আইডি আছে, ইউটিউবে একটা জনপ্রিয় চ্যানেলও আছে। তাই ভাবছি, এখন কী হবে?

-মোস্তাফিজ ফরায়েজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইলঃ ০১৭৩৭-৩৭৭০৯০

অপদার্থের পাত্রী দেখা জয় নারায়ন ভট্টাচার্য্য











অপদার্থের পাত্রী দেখা
জয় নারায়ন ভট্টাচার্য্য

বাসে উঠেই দেখি কোন সিট খালি নেই,একটি আসন ছাড়া।বাঁ পাশে একটি মেয়ে বসা।একেতো ক্লান্তি, তার উপর অনেক দুরের পথ দাঁড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।উপায় না দেখে সরাসরি মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম,আপনার সথে কি কেউ আছেন।অনেক কষ্টে মনে হলো যেনো চিরতার রস সেবন করছেন,অতপর না বললেন।আমি কি বসতে পারি?না মানে ইয়ে শুনে বললাম-ভয় নেই, এখন সূর্য়লোক।আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বসে পড়লাম।
আসনে বসেই বাড়িতে ফোন দিলাম।মা ফোন  ধরেই  কোথায় আছিস বাবা?মা আমি গাড়িতে উঠেছি,চিন্তা করো না,ঠিক সময় মতই পৌছে যাবো।হে রে পাত্রী দেখতে যে গেলি-মেয়েটি দেখতে কেমন।সংক্ষেপে বললাম,মা দেখতে ভালই।শুধুই ভাল,চুল কেমন।বুঝলাম একে একে সব বলতে হবে।তাই একনাগাড়ে বললাম,মা মেয়েটির শুধু চুল,মুখ, নাক নয়,মাথা থেকে পা পর্যন্ত এক কথায় অপূর্ব।পছন্দ হয়েছে খুব।মায়ের গলা, আমি জানতাম পছন্দ তর হবেই।মা এখন রাখি।রাখ,সাবধানে আসিস।
ফোন রেখে এই প্রথম মেয়েটির দিকে ভাল করে তাকালাম।জানালার দিকে মুখ,বাতাসে সোনালী চুলগুলো উড়ছে,সথে মিষ্টি একটা গন্ধ।বনলতার মতো না হলেও বেশ সুন্দরী।রুক্ষ নয়,মায়াবী এখটা ভাব আছে চেহারায়।চাঁদের আলো যেমন জোছনা ছড়ায় অনেকটা সে রকম।তাতেই আমি হয়তো সম্মোহিত ছিলাম অনেক্ষন।চমকে উঠলাম আচমকা প্রশ্নে।
কি দেখছেন?সাথে সাথেই কয়েকটা গানের কলি মনে এলো-তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,যদি বউ সাজো'গো আরও সুন্দর লাগবে গো,তুমি কোন কাননের ফুল ইত্যাদি।আবারও প্রশ্ন কি দেখছেন অমন করে?না-বললে ভুল বলা হবে,আসলে আপনাকে দেখছিলাম যা ধ্রুব সত্য।আমি কি আপনার পূর্ব পরিচিত। না,তবে আমরা পরিচিত হতে পারি।কি বলেন,পারি কি'না?কেমন করে বলুন?যেমন ধরুন আপনার নাম,বাবা,মা,বাড়ি কোথায় ইত্যাদি ইত্যাদি।
দাদুই আমার নাম রাখেন,কুলশ্রী গোস্বামী দেবী।আমি বললাম দাদুর নাম করন তবে সার্থক হয়েছে বলতেই হয়।আপনি বাকিটুকু বলুন।আমরা বলতে মা,বাবা ও ভাই সুবর্ণপুরে থাকি।বাবা প্রাঃ শিক্ষক।মামার বাড়ি কুড়ালি লক্ষিপুর।মা আপদ-মস্তক গৃহিণী।ছোট ভাই মাধব,ক্লাস নাইনে পড়ে।আমি তার থেকে পাঁছ বছরের বড়।পরিচয় বলতে এটুকুই,এবার দ্বিতীয় পর্বটা আপনি শুরু করুণ।
তাই,আপনি বেশ ঘুছিয়ে কথা বলেন আমি তার উল্টো।বাবার দেওয়া নাম নয়ন।বড় তিন ভাই তারা বিবাহিত, আমি সবার ছোট।সরকারী চাকুরীতে আছি।ঘরে শুধু আমি ও মা।বলার মতো এটুকুই।কি ভাবছেন?
ভাবছি বাচন ভঙিতে আপনিও কম যান'না।তখন মায়ের সাথে কি নিয়ে কথা হলো।হাসছেন যে,কি এমন বললাম যা আপনার হাসির খোরাক যোগালো।শুনবেন? হ্যা বলুন-আজ মা আমাকে পাত্রী দেখার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন।ভাগ্য বশত ওখানে যাওয়া হয়'নি।তাই না দেখেই বাড়ি ফিরছিলাম।মধ্যে আপনার সাথে দেখা,বাকিটুকু নিশ্চয় অজানা নয়।দম আটকে বললাম এই মিথ্যা-সত্যকে কি জীবন্ত  করা যায় না।জানালায় বাইরের দৃশ্য দেখে বুঝলাম গন্তব্য বেশী দুরে নয়,এবার বিদায় নেওয়ার পালা।সত্য-মিথ্যা থাক,আমরা দুজনই ভাল একটা সময় কাটালাম।কি ব্যাপার, হঠাৎ স্তব্দ হয়ে গেলেন?
দেবীকে কি এখনই বিসর্জন দিবেন,মায়ের সেবা করতে দিবেন না।দেবীর আসন না পাই দাসীর কাজ নিশ্চয় পারবো।মাকে বলা কথাও আপনার সত্যি হবে,হাতটা ধরবেন না?
আমি হাতটা সজোরে বুকে চেপে ধরি,খুশি আর উত্তেজনায় বুকে তখন ঢাকের শব্দ।কানে বাজছে বাঁশির সুর।পুরুষালি গলায় বলি, মাকে আগামীকাল  পাঠাবো তোমাদের বাড়ি।বাক্য দানের লগ্ন দেখতে।দেবীর চোখে জল,জল আমার চোখেও।বাস থেমে গেছে,চোখ মুছে বললাম-আসি।


"বিয়ে বাড়ি"ফয়সাল আহম্মেদ রনি














"বিয়ে বাড়ি"


আম্মুর সাথে বিয়ের দাওয়াত খেতে কম যাওয়া হয়। আম্মু কোনো কাজে আটকে থাকেন নাহয় আমি নিজেই ব্যস্ত থাকি। তবে আম্মুর সাথে যতবারই বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছি ততবারই অনেক মজা করেছি। মনে রাখার মতোই ছিল প্রতেকটা বিয়ের অনুষ্ঠান। তবে আজকের ঘটনাটা কিছুটা ব্যতিক্রম।

কয়েক মাস আগের কোনো এক রাতে আমি হাসপাতাল থেকে ডিউটি শেষ করে বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আম্মুর পাশে বসলাম।
প্রতিদিনই আম্মুর সাথে বসে আমার মনের রাজ্যের সব সুবিধা-অসুবিধা গুলো তুলে ধরি। আর আম্মু আমার মনোযোগ সহকারে শুনেন তারপর কিছু একটা মন্তব্য করে। একদিন কথা বলতে বলতে হঠাৎ আম্মু বলে উঠলেন আগামী বুধবার আম্মুর ছোটবেলার এক বান্ধবীর মেয়ের বিয়ে। আমার ব্যস্ততা না থাকলে আম্মু আমাকে নিয়েই বিয়ে বাড়িতে যেতে চান। আমিও আমার ডিউটি রোষ্টারে চোখ বুলিয়ে দেখলাম ঐ দিনটা তে ফ্রি আছি। তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিলাম,
আম্মু আমরা তাহলে বুধবার বিয়েতে যাচ্ছি। মনে মনে বেশ আনন্দ লাগলো, কেননা অনেকদিন পর আম্মুকে নিয়ে বিয়ের দাওয়াত খেতে যাব। অনেক মজা ও হবে। যদিও ছোট বেলার মত খেতে বসলে বলতে পারবো না চাচ্চু আমাকে আর একটু দধি দাও। বিয়ে বাড়ির দধি আমার খুব পছন্দ।

দেখতে দেখতে বুধবার চলে এলো। আমরাও দুপুরের মধ্যেই বিয়ের অনুষ্ঠানে পৌঁছে গেছি। আম্মুর বান্ধবী এবং পরিচিতদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের সাথে পরিচয় হয়ে আমার বেশ ভালো লাগলো। কেননা নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হতে আমার বেশ ভালোই লাগে। নতুনদের সাথে মিশলে নতুন নতুন বিভিন্ন ধরনের গল্প, কবিতা, ছড়া শোনার সৌভাগ্য হয় আমার। তাছাড়া দল বেঁধে একসাথে গল্প করার মজাই আলাদা।

যাইহোক বিয়ে বাড়িতে আসছি বউটা দেখে আসি। বিয়ে বাড়িতে বউ না দেখলে পরক্ষনেই কেমন একটা অাফসোস লাগে।

বউ দেখতে গিয়েই বড়সড় এক ধাক্কা খেলাম, কেননা মেয়েটা ছিল অনেক সুন্দরী। আজকাল বিয়েতে বউকে যেভাবে পার্লার থেকে ময়দা মাখিয়ে নিয়ে কিন্তু এই মেয়েটা বরাবরই ঠিক তার উল্টো। সাধারণ সাজে মেয়েটা সত্যিই অসাধারণ। আমি মুগ্ধ হয়ে মেয়েটিকে দেখতে দেখতে ধ্যানে পরে গেলাম। এমন সময় আম্মু আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসলেন খাওয়ার জন্য।

খেতে বসে আম্মু জিজ্ঞেস করলো কিরে খাবার কেমন হয়েছে?
আমি স্বভাবত ইচ্ছে করেই বিয়ে বাড়ির দোষ দিয়ে বললাম সবসময় উল্টো টা বলতাম- দধি টা আরেকটু ঠান্ডা হলে ভালো হতো, কেননা দধি আমার খুবই পছন্দের একটা খাবার। অবশ্য সেটা আগেও বলেছি।

আম্মু আমাকে অবাক করে খাবার খাওয়া থামিয়ে দিয়ে বললেন 'একটা কথা বলব? '
হুম বলে ফেলো।
আজ যে মেয়েটির বিয়ে, ওর বিয়েটা তোর সাথে হলেও হতে পারতো। মেয়ে পক্ষ খুব বলেছিল তোর কথা। কিন্তু আমি তোর কথা ভেবে তা হতে দেইনি। মাএ তো ডাক্তারি পাস করলি, এখন বিয়ে দেই কি করে?

আম্মুর কথা শেষ হলো, আর আমার চারদিক অন্ধকার হয়ে আসলো। খুব মনে পড়ছে লাল শাড়ি পরা অন্যের বউ সেজে থাকা মেয়েটির কথা। তখন আফসোস করে মনে মনে বলতে লাগলাম- "কোনো কিছু পেয়ে হারানো সত্যিই বেদনাময়"।

আম্মুর কথা শুনে আমার বদহজম হয়েছে, তাই আর খাবার খাওয়ার মতো দ্বিতীয়বার ইচ্ছে জাগলো না।

তারপর থেকে আম্মুকে নিয়ে কোনো বিয়েতে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার আজ অবধি হয়ে উঠে নি।


লেখকঃ ফয়সাল আহম্মেদ রনি
বনানী, ঢাকা-১২১২
মোবাইলঃ ০১৫৫৮-০৩৪৯৮১
০১৮৪৬৪২১৬৮৯
ই-মেইলঃ- dr.roni55@gmail.com