লাল ফিতা
কামরুজ্জামান
তোমার নিয়ে লেখা আমার যত গান-কবিতা,
জানে না কেউ সে বেদনার কি নিদারুন দুঃখ-ব্যথা।
সবুজ শ্যামল গাছে ছায়ে; ঘেরা মোদের গাঁ,
এই গাঁয়েরি বিজলী মেয়ের নূপুর পরা পা।
সন্ধ্যা বেলায় নদীর ধারে বাজাই আমি বাঁশি,
তোমার কানে বাঁশির সুর বাতাসে যায় ভাসি।
আমার পাশে বসতে তুমি মৃদু পায়ে এসে,
একলা মনে চলে যেতে শুষ্ক হাসি হেসে।
পাড়ার সবাই মিলে খেলেছি কত খেলা,
নদীর ধারে পুকুর পাড়ে সকাল-সন্ধ্যা বেলা।
মাঝে-মাঝে সকাল-সন্ধ্যা চোখের তারায় জাগে,
কখনো কখনো একা একা হৃদয়ে ব্যাথা লাগে।
কুড়ি বছর আগে-কোন এক কুয়াশা মাখা ভোরে,
খেজুর পাড়তে উঠে-গিয়েছিলাম পড়ে।
কেঁটে ছিলো হাত ইটের কোনায় লেগে,
রক্ত দেখে কেঁদেছিলে তুমি কিসের আবেগে!
ধরেছিলে চেঁপে কাঁটা হাত তোমার নরম হাতে,
কিসের মায়ার-টানে সে দিন পারিনি জানতে।
খুজেছিলে চারিপাশ দূর্বা ঘাস ব্যাকুল হয়ে,
নীরব হয়ে আমি তোমার নয়নে ছিলাম চেয়ে।
এক মুঠো ঘাস মুখে ভরে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে,
ক্ষতের উপর মলমের মত দিলে লাগিয়ে।
দিয়েছিলে সেবা আহত পাখির মত কেঁদে-কেঁদে,
মাথার লাল ফিতা খুলে ক্ষত হাতে মোর দিলে বেঁধে।
কোন এক শীতের রাতে ঘুম থেকে জেগে শুনি,
বিজলীর বাপের লাশের পাশে কুরআন পড়ার ধ্বনি।
তার একটু পাশেই চিৎকার করে কাঁদে বিজলীর মা,
মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার পরান মানে না।
ছয় মাস পরে বর্ষাতে বিধি ছাড়া জানে না কেউ,
বিজলীর মায়ের বুকে উঠলো অজানা ব্যাথার ঢেউ।
সপ্তাহ খানিক সেই ব্যাথায় শুয়ে বিছানায় হায়,
চির দিনের মতো সন্ধ্যার আঁধারে পড়লো ঘুমায়।
সে দিন বুঝিনি আমি বাবা-মায়ের কবর পাশে,
মন ভার করে বিজলী একা একা থাকে বসে।
সকলে তার মাথায় রেখে হাত চোখ দেয় মুছে,
বাবা-মা ছেড়ে সেই ছোট্ট মেয়ে কি করে বাঁচে।
কিছুই মনে নেই আর আমার শুধু কিছু দিন পরে,
অচেনা কে যেনো এসে বিজলীর হাতটি ধরে।
নিষ্ঠুর পাষাণ হয়ে জোর করে নিয়ে গেলো দূরে,
যাবার বেলা সে বারে বারে পিছুন ফিরে।
নয়ন আকুল করে দেখেছিলো শুধু আমার,
হয়তো সে দিন কয়েক ফোঁটা অশ্রু বদনে তার;
গোপনে পড়েছিলো ঝরে আমার অগোচরে।
বোবা কাঁন্না কেঁদে কি চেয়েছিলো সে দিন কচি অন্তরে।
তার যাওয়ার পরে বছরে বছরে শরীর হয়েছে ভার,
বহুবার কাতর হয়ে হয়েছি পাথর আমার চারিধার।
দূর থেকে জোনাকীর মতো প্রতিরাতে জ্বেলে আলো,
তুমি জানো না, তোমাকে বেসেছি কতো খানি ভালো।
এর পর একে একে হলো কুড়িটি বছর পার,
আবার নতুন করে হলো দেখা তোমার আমার।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার বাসে দু'জন এক সাথে,
পাশাপাশি তবু কেউ কারো পারিনি চিনতে।
কোলের উপর বসা তোমার আট বছরের মেয়ে,
কুড়ি বছর পর ঠিক তোমার মতো আছে তাগিয়ে।
সহসা জানতে চাইলাম মামনি কি নাম তোমার,
"কুসুম" আঙ্কেল বলে ঠোঁটে ফোটে হাসির জোয়ার।
শৈশবের কথা ভাবি আমি একা নীরব মুখে,
কতবার চেয়েছিলাম তোমার মেয়ের চোখে।
কুড়ি বছরের তফাতে আজ তুমি কত খানি পর,
পারিনি হিসাব মিলাতে আমার এ বিষন্ন অন্তর।
গোটা দেশ হরতাল অবরোধে গেছে ছেয়ে,
বাসে উঠে ছুটিতে আসি বাড়ি উপায় না পেয়ে।
হঠৎ মারলো ককটেল মিছিলের সম্মুখ থেকে,
কুসুমের কাঁটলো হাত বাসের ভাঙা গ্লাস লেগে।
মেয়েকে বুকে জড়িয়ে তুমি কেঁদে দিশাহীন,
কুড়ি বছর সেই কন্ঠস্বরে আমি উদাসীন।
কাঁটা হাতের রক্ত দেখে চোখ ছলছল করে,
কুড়ি বছরের স্মৃতি আমার ভাসায় অাঁধারে।
একরাশ দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয় দিগন্ত বাতাস,
যেন কষ্টের মেঘ জড়ো হয়ে ভরে নীলাকাশ।
অচেনা মা-মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক অনেক দুর,
তবু জানিনা কি কারনে মনে বাজে কোন বিরাহ সুর।
ব্যাগ থেকে শেভিংক্রিম বের করি অতি যত্ন করে,
লাগিয়ে দিলাম কুসুমের কাঁটা হাতের ক্ষতের উপরে।
তুমি কি যেন ভাবছিলে মেয়ের হাত খানি ধরে,
কষ্টের ঢেউ যেন তোমার বিষন্ন মুখে-বিষন্ন অন্তরে।
সাপুড়ে যেমন সাবধানে ডালী থেকে সাপ বের করে,
সাপুড়ের মত অবুজ আমি কুড়ি বছর পরে।
ব্যাগ থেকে এক লাল ফিতা করলাম বের,
ক্ষত হাতে বেঁধে রক্ত করলাম স্থির কুসুমের।
লাল ফিতা দেখে তোমার ভয়ে অন্তর উঠলো নড়ে,
আমার দিকে বিস্ময়ে তাকালে মেয়ের হাত ছেড়ে।
আমার চোখে রাখলে তোমার মায়াবী ঐ চোখ,
কুড়ি বছর পরে কুড়ি সেকেন্ড দেখলে অপলোক।
কুসুমের এক পাশে আমি আর অন্য পাশে তুমি,
বহুদিন পর প্রখর দুজনার দু'টি মন মৌন মরুভুমি।
শুধু নড়ে উঠে তুমি কি যেন খুঁজলে আমার চোখে,
ছেয়েছে কালো মেঘ ফর্সা মুখে পাহাড় সমান দুঃখে।
ভেবেছি কতো তোমায় আমি-নিষ্ঠুর পাষাণী স্বার্থপর,
আমার মতো দীর্ঘশ্বাসে কেঁটেছে তোমার কুড়িটা বছর।
আগে জানিনি আমি বুকে তোমার কষ্ট ভরা নদী,
কুড়িটি বছর বয়ে চলেছে নীরবে নিরবধি।
অপরাধী চোখে চেয়ে আছি কুড়ি বছরের দিকে,
জোর করে হাসি মলিণ মুখে কষ্টের ছাঁপ নিয়ে বুকে।
পাইনিকো দিশে হারিয়ে তোমায় কুড়িটি বছর শেষে,
জানিনা কখন গেছে আমার জীবনের স্রোতে মিশে।
লাল ফিতা দেখে আজ তোমার ব্যথায় ভরে বুক,
রক্ত রাঙা ফিতা খানি আমার কুড়ি বছরের সুখ।
পুরাতন ফিতা খানি দেখে ফেললে আমায় চিনে,
স্বপ্ন হীন কুড়ি বছর পাইনি সুখ আমি তুমি বিনে।
ফিতার মানে জানতে কথা থেমে গেলো মুখে,
ভুবনের আছে যত ভাষা কেঁদে ফিরে গেলো দুখে।
কতো জায়গায় ব্যাগে করে কুড়িটি বছর বয়ে,
ঘুরেছি কতো আমি লাল ফিতা খানি লয়ে।
কতো শত বার ব্যাগ থেকে ফিতা খানি বের করে,
দেখতাম সমস্ত নিশি ভরে অশ্রু আমার যেতো ঝরে।
সাগরের পানে ছুটে চলা নদীর মতো এ দু'টি চোখ,
ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে জেগে উঠে মোর শোক।
বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী তার মরে যায়,
এতো বড় পৃথিবীতে অভাগীর আর কেহ নাই।
মেয়েকে নিয়ে জীবন কাটে অতি দুঃখ কষ্টের সনে,
পুরোনো ব্যাথা খানি তার জেগে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
সুখে না হোক দুঃখে কুড়িটি বছর দিয়ে পাড়ি,
আজ শূন্য জীবন পূর্ণ করতে দিলে সব ছাড়ি।
আজও আমি একা শুধু তোমার জন্য অভাগী,
দু'এক বছর নয়, রইলাম কুড়িটি বছর জাগি।
অভিমানী মুখে গড়ে পড়েছে চোখের লোনা পানি,
বাসতে কতো ভালো আমায়-জানি আমি জানি।
উদাসিনী বিজলী বালা একেলা তার মতো বুঝি,
ছোট বেলা আমি এখনো খুঁজি দু'চোখ বুজি।







